শিবিরের আত্মপ্রকাশ প্রসঙ্গেযেখানে মনোযোগ দেয়া দরকার!

নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ নাৎসিবাদী কায়দায় ”মুক্তিযুদ্ধের চেতনা”-কে জার্মান জাত্যাভিমান এবং মুক্তিযুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির নামে ইহুদিদের অপরায়ন-নিধনের মত জামাত-শিবিরকে অপরায়ন-নিধনের শিকারে পরিণত করেছিল। আমরা জানি, এই অপরায়ন-নিধন বাহ্যত ইহুদিবিরোধীতা হলেও সারবস্তুতে ছিল ফ্যাসিস্ট জাত্যাভিমানি উন্মাদনা ও ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার আদর্শিক হাতিয়ার ছিল মাত্র। আওয়ামী লীগ ঠিক তা-ই করেছিল। সবধরণের বিরোধীতাকে তারা ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি’ দাগিয়ে দমন করত। যেকারণে অর্থ ও সম্পদের বিনিময়ে জামাত-শিবিরের সাথে গোপন সমঝোতা ও আশ্রয় দেয়াতেও তাদের কোন সমস্যা হয়নি।

সাধারণভাবে কোন রাজনৈতিক দল শারীরীক দমন-পীড়নের মুখে আত্মগোপনে কার্যক্রম পরিচালনার পর অনুকূল পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে আসাতে- নিশ্চয় দোষণীয় কিছু নেই। কিন্তু জামাত-শিবির প্রশ্নকে এই প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ ও আবর্তিত করার অর্থ হবে প্রকৃত প্রসঙ্গকে আড়াল করা।

১৯৯০-এর গণ অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সমাজ জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। এই নিষিদ্ধকরণের পেছনে দু’টি যুক্তি ছিল: প্রথমত তারা ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট রাজনীতি লালন করে এবং দ্বিতীয়ত এই রাজনীতির ধারক হিসাবে তারা কেবল ইতিহাসের নৃসংশতম ’৭১-এর গণহত্যার অংশীদারই নয়, বাংলাদেশে তারা হত্যা-রগ কাটার মাধ্যমে দখলদারির রাজনীতিও কায়েম করেছিল। আমাদের খেয়াল করা দরকার যে এই নিষিদ্ধকরণ কোন ফ্যাসিস্ট-স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দ্বারা নয়, বরং নব্ববইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রগামী ছাত্র সমাজের গণতান্ত্রিক আকাঙক্ষার বহিঃপ্রকাশ রূপে ঘটেছিল। এই ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী রাজনীতিই জামাত-শিবির বহন করে চলেছে। তাই প্রশ্নটা এখানে নয় যে, দমনের মুখে আত্মগোপনকারী একটি সংগঠন কেন ছাত্রলীগে মিশেছিল, কেন তারা গোপনে নেতৃত্ব দিয়েছিল বা এখন প্রকাশ্যে এসে কৃতিত্ব দাবি করছে। প্রশ্ন এখানে যে, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দ্বারা নিগৃহীত এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গোপনে বা প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করলেই কি জামাত-শিবিরের ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী রাজনীতি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে কিনা; যে যুক্তিতে তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল সেগুলো নিজ থেকে বাতিল হয়ে যায় কিনা। এই প্রশ্নটি বোঝাপড়ার জন্য আমাদের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির উদাহরণ বেছে নেয়াটা সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

জনগণের শত্রুদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব থাকলে কখনো শত্রুর শত্রু জনগণের আপাত মিত্র হলেও চূড়ান্ত অর্থে মিত্র হয় না। এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব জনমনে ধোঁয়াশার জন্ম দেয়। একাত্তরের পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের গণহত্যার প্রতি ঘৃণা এবং জনগণের মুক্তির তীব্র আকাঙক্ষা এবং আওয়ামীলীগ ও ভারতের স্বার্থ – দুই বিপরীত জায়গা থেকে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছিল। আওয়ামীলীগও পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। জনগণ বিশ্বাসঘাতক আওয়ামী লীগ ও ভারতকে বন্ধু ভেবেছিল। বস্তুত তারা ছিল জনগণের শত্রু, কেবল শত্রুর মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে জনগণের সামনে মিত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিল মাত্র। তাই এটা আজব ব্যাপার না যে, ‘মুক্তিযুদ্ধের নেতারা” অচিরেই বাকশালি ফ্যাসিবাদরূপে ও ২০০৯ থেকে তারা হাসিনা আওয়ামী ফ্যাসিবাদরূপে আবির্ভূত হয়েছিল এবং দেশের জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাতে নৃশংসতার পরাকাষ্ঠা দেখাতে পেরেছিল। আজকে দালাল ও অন্ধরা ছাড়া সবাই স্বীকার করবেন যে, পাক-ফ্যাসিস্টদের শোষণ-বঞ্চনা-গণহত্যার বিরুদ্ধে জনগণের ন্যায্য ঘৃণা আর আবেগ থেকে একাত্তরে “জনগণের নেতা বনে যাওয়া” বিশ্বাসঘাতক আওয়ামীলীগকে পৃথক করা দরকার এবং একাত্তরে নেতা বনে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন ও গণহত্যার দায় এতটুকু মার্জনাযোগ্য হতে পারে না। বরং জোর গলায় দাবি করা দরকার, জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাবার পর এই ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী রাজনীতি এদেশের মাটিতে কিছুতেই চলতে পারে না।

উপরোক্ত যুক্তিধারায় আওয়ামী ফ্যাসিবাদের জুলুমের শিকার এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, এমন কি গোপনে সংগ্রামের নেতা বনে গেলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী রাজনীতির ধারক-বাহক জামাত শিবিরের রাজনীতি এদেশে এতটুকু গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, বরং তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করাই যুক্তিযুক্ত।

একাত্তরের আগে আওয়ামীলীগ ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী রূপে আবির্ভূত হয়নি। ফলে তারা প্রকাশ্যে আন্দোলনের নেতা হতে পেরেছিল, জনগ্রহণযোগ্যতার সমস্যা হয়নি। কিন্তু জামাত-শিবিরের ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী রাজনীতি জনগণের কাছে চিহ্নিত ও ঘৃণীত ছিল। যে কারণে গণতান্ত্রিক ছাত্র সমাজ তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। ফলে ২৪-এর আন্দোলনের নেতৃত্বে অনুপ্রবেশের জন্য কেবল শত্রু নয়, জনগণের কাছ থেকেও তারা পরিচয় গোপনে বাধ্য ছিল।

এখন এটা পরিস্কার যে, গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি, এবি পার্টি, জামাত, শিবির সমঝোতার ভিত্তিতে বাছাই করা সমন্বয়কদের মাধ্যমে আন্দোলনের নেতৃত্ব কব্জা করে নিয়েছিল। কৌশলে অন্যদের দূরে ঠেলে দিয়েছিল অথবা অলঙ্কার হিসাবে ব্যবহার করেছিল। সবচেয়ে জঘন্য গর্হিত ঘটনা হলো, জনগণকে অন্ধকারে রেখে বৈদেশিক শক্তির সাথে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে জনগণের রক্তের ওপর দিয়ে একটা গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতার অংশীদার বনে গেল। এখন তারা সেই ক্ষমতা উপভোগ করছে। অনেকে আবার একে জামাত-শিবিরের কৃতিত্ব বলে দাবি করছেন। জনগণকে বোকা বানাবার কৃতিত্ব যদি কৃতিত্ব হয়, তবে তা তারা দাবি করতেই পারে। কিন্তু আমরা ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা থেকে বিরত হবো না- তা সে আওয়ামী কিংবা জামাতি- যাই হোক না কেন।

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন