ঘোষণা

(খসড়া, ৭ নভেম্বর, ২০০৮)

() মুঘল ভারতের শেষদিকে পুঁজিবাদ অর্থাৎ, উন্নততর সমাজ বিকাশের প্রাথমিক শর্ত সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু, বৃটিশ উপনিবেশিক শক্তি  সেই পুঁজির সম্ভাবনা ধ্বংস করে, জমিদারি ব্যবস্থার আকারে পুরনো সামন্তবাদী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখে। বেনিয়া মূলধনও জমিদারীতে ব্যয়িত হয়ে যায় এবং তার পুঁজিতে রূপান্তর ব্যহত হয়। সামাজিক বিকাশ ও অগ্রগতি রূদ্ধ হয়।

একসময় উপনিবেশিক ভারতে সামন্তবাদের ভিত্তির উপর পুঁজিবাদের উদ্ভব ঘটে, কিন্তু আজকের পূর্ববাংলা অঞ্চলটি পরিণত হয় কোলকাতার পশ্চাদভূমিতে। ফলে, এখানে পুঁজিবাদের বিকাশ হয় অবদমিত।

উপনিবেশিক ভারতে পূর্ববাংলা অঞ্চলের জনগণ সবসময় সকল বৈদেশিক হামলা ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং প্রতিরোধ চালিয়েছেন। এ অঞ্চলের জনগণের ইতিহাস হচ্ছে বীরত্বপূর্ন সংগ্রামের ইতিহাস। পূর্ববাংলার জনগণ বৃটিশ উপনিবেশবাদ ও তার দালালদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ধর্মীয় অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেন।

ভারতে উপনিবেশবাদের দালাল এবং সামন্তবাদের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের প্রত্য পৃষ্ঠপোষকতায় এক একচেটিয়া পুঁজিবাদ বিকশিত হয়। এই পুঁজির মালিক হলো ভারতের আমলাতান্ত্রিক বা বড় বুর্জোয়া শ্রেণী। এই বড় বুর্জোয়া শ্রেণী (মুসলিম ও অমুসলিম বুর্জোয়া)  নিজস্ব শ্রেণী স্বার্থেই এক সময় স্বাধীনতার দাবী তুলে। পরে স্ব স্ব স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে আন্দোলনকে বিভক্ত করে।

তদস্বত্ত্বেও জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম উপনিবেশবাদীদের বাধ্য করে তাদের সমর্থক ও সহযোগী বুর্জোয়া শ্রেণীর (মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস) নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরে। এভাবে পাকিস্তান ও ভারতের সৃষ্টি হয়।

এদিকে, পূর্ববাংলার মুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্ত শ্রেণীর বিকাশের দু’টি বাধা ছিল, একটি হলো বৃটিশ উপনিবেশবাদ আর একটি হিন্দু বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ধর্মীয় নিপীড়ন। পূর্ববাংলার বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করে এবং মুসলিম শ্রমিক-কৃষকদের পাকিস্তান দাবীর পিছনে ঐক্যবদ্ধ করে। তারা পাকিস্তানে যোগ দেয় এবং এভাবে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের প্রদেশে পরিণত হয়।

বাঙ্গালী বুর্জোয়া ও সামন্তদের (যারা খুবই সংখ্যাল্প) চেয়ে বহুগুণ বিকশিত অবাঙ্গালী মুসলিম বুর্জোয়া ও সামন্তরা স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব কুগিত করে। বৃটিশ উপনিবেশবাদীরা রাষ্ট্র ক্ষমতা তাদের নিকট হস্তান্তর করে। বৃটিশ তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুরনো উপনিবেশিক রাষ্ট্র বজায় থাকে। এই রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদ, অবঙ্গালী বড় বুর্জোয়া এবং সামন্তবাদীদের স্বার্থ রক্ষাকারীতে পরিণত হয়।

অবাঙ্গালী মুসলিম বড় বুর্জোয়া ও সামন্তরা রাষ্ট্রযন্ত্রের একচ্ছত্র মালিকানা লাভ করে এবং নিজ শ্রেণী বিকাশের অবাধ সুযোগ পায়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় বড় বুর্জোয়াদের একাংশ আমলা বুর্জোয়ারা দ্রুত বিকশিত হয়। তারা সামরিক ক্যুদেতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দখল করে। তারা কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশ এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ গভীরতর করার স্বার্থে খোদ কৃষকের হাতে জমি দেয়ার পরিবর্তে ছোট ও মাঝারি জমিদার-জোতদার-মহাজনী ব্যবস্থাকে সংহত করে। এভাবে পূর্ববাংলাসহ পাকিস্তানে আধা-সামন্তবাদী ব্যবস্থা নতুনরূপে বজায় থাকে।

এ পাকিস্তানী শাসকশ্রেণী পূর্ববাংলার স্বতন্ত্র জাতীয় ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য স্বায়ত্বশাসন কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রদানের পরিবর্তে একে অবাধ শোষণের ক্ষেত্রে পরিণত করে। এভাবে এখানে প্রথম থেকেই জাতীয় নিপীড়ন ও শোষণ বিদ্যমান ছিল। এ শাসকশ্রেণীর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই জাতীয় নিপীড়ন উপনিবেশিক শোষণের রূপ নেয়।

এভাবে বৃটিশ উপনিবেশিক শক্তির উৎখাত সত্ত্বেও স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জিত হয়নি। একটি উন্নত ও প্রগতিশীল, স্বাধীন, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন সত্য হয়নি।

() এ প্রেক্ষিতে পুর্ববাংলায় অবাঙ্গালী বড় বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীদের শোষণ-নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে বিকশিত হতে থাকে। পূর্ববাংলার দালাল বুর্জোয়া ও সামন্তরা নিজ বিকাশের স্বার্থে জাতীয় নিপীড়নের বিরোধীতা করে। জনগণের নিজস্ব সংগঠন ও শক্তির অভাবে পূর্ববাংলার জনগণের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব বুর্জোয়া এবং সামন্তদের প্রতিনিধি আওয়ামীলীগের হাতে চলে যায়। তারা জনগণের জঙ্গী আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও নির্বাচনের কানাগলিতে প্রবেশ করায়। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি উপনিবেশিক সামরিক ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার উপর গণহত্যা ও অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।

পূর্ববাংলার জনগণ জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনের জন্য ১৯৭১ সালে বিদ্রোহ করেন। তাঁরা পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন, লক্ষ লক্ষ জনগণ প্রাণ হারান, তাদের ধন-সম্পত্তি, সহায়-সম্ভ্রম লুঠ হয়।

পূর্ববাংলার দালাল বুর্জোয়া, সামন্ত শ্রেণী এবং তাদের প্রতিনিধি আওয়ামীলীগ জনগণকে অরক্ষিত রেখে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের কোলে আশ্রয় গ্রহণ করে।

এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ পূর্ববাংলায় উপনিবেশ স্থাপনের পথে অগ্রসর হয়। ভারতীয় সামরিক বাহিনী যৌথবাহিনীর ছদ্মবেশে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং পূর্ববাংলা দখল করে নেয়। তারা উপনিবেশিক কায়দায় পূর্ববাংলায় আওয়ামীলীগের পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসায়। নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন উপাদান গড়ে তোলে। নানা অসম চুক্তির মাধ্যমে এবং অবৈধ পথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

বিশ্ব পরাশক্তি হিসাবে রুশ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে সাহায্য করে এবং তাদের মাধ্যমে পূর্ববাংলার উপর প্রধান্য বিস্তার করে।

ক্ষমতাসীন দালাল বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা সামন্তবাদকে রক্ষা করে এবং কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটাতে অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।

এভাবে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও রুশ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের হস্তেেপর ফলে পূর্ববাংলার জনগনের জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসমাপ্ত থেকে যায়।

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার বিশ্বাসঘাতকরা আন্তর্জাাতিক স্বিকৃতি, জাতীয় পতাকা আর মানচিত্র দিয়ে এই পরাধীনতাকে আড়াল করে। জনগণকে ধোকা দেয় এবং বিভ্রান্ত করে। এভাবে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানি উপনিবেশিক সামরিক ফ্যাসিস্ট শক্তির উৎখাত সত্ত্বেও জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি; পশ্চাদপদতা থেকে মুক্ত হয়ে একটি উন্নত জাতি হিসাবে নিজেদের গড়ে তোলার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেছে।

() এদেশের জনগণ প্রথম থেকেই ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তাদের তাবেদার আওয়ামীলীগের পুতুল সরকারের বিরূদ্ধে তীব্র সংগ্রাম শুরু করেন।

বাংলাদেশ পুতুল সরকার ও তার প্রভু ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা জনগণকে দাবীয়ে রাখা ও তাদের ফ্যাসিস্ট একনায়কত্ব চালাবার জন্য বিভিন্ন সশস্ত্র ভাড়াটে বাহিনী গঠন করে। তারা প্রায় অর্ধলক্ষ  দেশপ্রেমিক মুক্তিকামী জনতাকে হত্যা ও গুম করে। আওয়ামীলীগ ও অন্যান্য বিশ্বাসঘাতক এবং তাদের উপনিবেশিক প্রভু ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের শোষণ-লুন্ঠণ আর অত্যাচারে অল্প সময়ের মধ্যেই জনজীবনে নেমে আসে চরম অরাজকতা। কয়েক লক্ষ মানুষ দূর্ভিক্ষে অনাহারে মারা যান আর ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের তাবেদাররা রাতারাতি অঢেল অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে।

১৯৬০ দশক হতে বিকাশমান পূর্ববাংলাস্থ বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালী আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ রাষ্ট্রীয়করণ করার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের (পূর্ববাংলার) আমালতান্ত্রিক পুঁজিবাদ রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদ আকারে রূপ লাভ করে। ফলে বড় বুর্জোয়াদের একাংশ দ্রুত আমলা বুর্জোয়ারূপে বিকশিত হয়। এভাবে উপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী ব্যবস্থার ভিত্তির উপর আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বিকশিত হতে শুরু করে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব লাভের জন্য আমলা ও দালাল বুর্জোয়া অংশের মধ্যে স্থায়ী দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটে।

দালাল ও আমলা বুর্জোয়া এবং তাদের নানা উপদলের মধ্যকার দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে আন্ত:সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব (অর্থাৎ, রুশ-ভারতের সাথে মার্কিনের দ্বন্দ্ব) ক্রিয়াশীল হয়। তথাকথিত “সৈনিক-জনতার বিপ্লব” রুশ-ভারতের তাঁবেদার মুজিব সরকারের উৎখাতের মধ্যদিয়ে আমলা বুর্জোয়রা রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দখল করে। মার্কিন পরাশক্তি, পাক-সৌদি ও চীনের সমর্থনপুষ্ট দেশবিক্রেতা মেজর জিয়ার সামরিক সরকারের সময়কালে এক সামরিক ক্যু, পাল্টা-ক্যু এর ঘটনার মধ্যদিয়ে এই আমলা ও দালাল বুর্জোয়া এবং তাদের বৈদেশিক প্রভুদের দ্বন্দ্ব প্রতিফলিত হয়। এভাবে এদেশের উপর ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের উপনিবেশিক আধিপত্য খর্ব হয়ে আধা-উপনিবেশিক রূপ নেয়, রুশ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের প্রাধান্য খর্ব হয় এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই হলো বাংলাদেশের (পূর্ববাংলার) সমসাময়িক সমাজ। কিন্তু, তথাকথিত “সৈনিক-জনতার বিপ্লব” জাতি ও জনগণের মুক্তি আনেনি, বয়ে এনেছে নতুন শৃঙ্খল।

() জিয়া সরকারের উৎখাত এবং এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারী শাসনকালে একসারি সামরিক ক্যুদেতার মধ্যদিয়ে পুনরায় পূর্বোক্ত দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে। সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও তাদের দালাল; আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এবং সামন্তবাদের প্রতিনিধি সামরিক-স্বৈরাাচার এরশাদ সরকার রাখঢাকহীন সর্বগ্রাসী শোষণ-লুণ্ঠন করে। ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করার জন্য জনগণের উপর নির্মম জুলুম-অত্যাচার করে। কিন্তু, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য জনগণ বীরত্বের সাথে স্বৈরাচার বিরোধী এক জঙ্গী সংগ্রাম ও গণআন্দোলন গড়ে তোলেন।

জনগণের প্রতিনিধি সম্বলিত শক্তিশালী সংগঠন ও নেতৃত্ব না থাকায় আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এবং সামন্তবাদের প্রতিনিধিত্বকারী অপর উপদলসমূহ যথা: বিএনপি, আওয়ামীলীগ ও তাদের লেজুড় রাজনৈতিক দলগুলো এ জঙ্গী সংগ্রাম ও আন্দোলনের নেতৃত্ব দখল করে। জনগণের বিদ্রোহের মুখে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ এবং প্রতিক্রিয়াশীল বড় বুর্জোয়াদের আঁতাতের মধ্যদিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ বড় বুর্জোয়াদের অপর প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, যাতে জনগণের সংগ্রাম বিপ্লবী খাতে প্রবাহিত না হয়।

গণআন্দোলনের মধ্যে যে সাম্রাজ্যবাদ, সম্পসারণবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা রূপ পেয়েছিল তা এই আমালাতান্ত্রিক বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীদের প্রতিনিধি আওয়মীলীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলি বর্জন করে। তারা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে জনগণের উপর সংসদীয় একনায়কত্ব চাপিয়ে দেয়। এভাবে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম আবারো অন্ধকারে পথ হারায়।

() বলাবাহুল্য, নির্বাচন ও সংসদীয় পদ্ধতির মধ্যে আমলা ও দালাল বুর্জোয়া ও তাদের নানা উপদলের মধ্যকার দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। যে কোন প্রকারে ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য আওয়ামীলীগ ও বিএনপি-র নেতৃত্বে বড় বড় সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সামন্তবাদী এবং তাদের প্রতিনিধি নানা রাজনৈতিক দলগুলো দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে মরিয়া সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। তাদের বৈদেশিক প্রভুদের দ্বন্দ্ব এই দ্বন্দ্বের মধ্যে ক্রিয়াশীল হয়। তবে এসব দ্বন্দ্বে চূড়ান্তভাবে নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণ করে প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রের প্রধান উপাদান হিসাবে সেনা বাহিনী।

শাসকশ্রেণীর মধ্যকার এই দুই বৃহৎ উপদলের মধ্যকার তীব্র বিরোধের এমন নজির খুব কম দেশেই দেখা যায়। তীব্র বৈরীতার কারণে শাসকশ্রেণী তার উপদল-নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গভীর সংকটে পড়ে। তারা আপাতঃ মীমাংসার জন্য আমলাতন্ত্রের দ্বারস্থ হয় এবং তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমদানী করে। তত্ত্বাবধায়করা শাসকশ্রেণীর দলাদলি “নিরপেক্ষ ও অবাধ” নির্বাচনের মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌছানোর চেষ্টা করে। কিন্ত, তা ব্যর্থ হয়। সংসদীয় স্বৈরাচারের ১৬ (১৯৯০-২০০৬) বছরে নির্বাচন, প্রহসনের নির্বাচন, নির্বাচনের ফল বর্জন, সংসদ অকার্যকর করে আন্দোলনের নামে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, এর মধ্যেই সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের ক্যু, রাষ্ট্রের দলীয়করণ, ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি অসংখ্য ঘটনার মধ্যে এই সমাধান অযোগ্য বৈরীতা প্রতিফলিত হয়েছে।

() ৩৫ বছরের, বিশেষতঃ বিগত ১৬ বছরের শোষণ-নিপীড়ন, দুর্নীতি ও দুঃশাসনে অর্থনৈতিক সংকট যখন চরমে পৌঁছে, ২০০৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর মধ্যকার হানাহানি গভীর সংকটের জন্ম দেয়, যখন এদের করাল গ্রাস থেকে বাঁচার তাগিদে শ্রমিক, কৃষক জনগণ বিদ্রোহ করতে শুরু করে, তখন প্রতিক্রিয়াশীলদের শোষণ ও নিপীড়নমূলক শাসন ব্যবস্থাটা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। আর ঠিক তখন এক-এগারোর ক্যু দেতা সংঘটিত হয়।

সিভিল পোষাকে এই সামরিক অভ্যূত্থান ঘটে সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের আশীর্বাদে বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নীলনকশা ও নির্দেশে। এভাবে সাম্রাজ্যবাদ তার কেনা গোলামদের সাহায্যে ভঙ্গুর শোষণ-নিপীড়ণমূলক ব্যবস্থাটাকে রক্ষা ও মেরামত করার জন্য নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করে।

গত ৩৭ বছরের এই বড় বুর্জোয়াদের নিজেদের ইতিহাস হলো সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে দেশবিক্রি ও জাতীয় পরাধীনতার ইতিহাস। পশ্চাদপদ সামন্তবাদী ব্যবস্থা, অনুন্নয়নের যাঁতাকলে জনগণকে পিষ্ট করার ইতিহাস। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য, উন্নত ও প্রগতিশীল জাতি গঠনের জন্য সংগ্রামরত জাতি ও জনগণের উপর দমনপীড়নের ইতিহাস। জাতি ও জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিয়ে আমলা ও দালাল বুর্জোয়াদের নানা উপদলের মধ্যকার তীব্র সংঘর্ষ ও স্থায়ী সংকটের ইতিহাস।

এই সংকট ও সংঘর্ষ হতে তাদের কোন মুক্তি নেই। যতণ না এদেশের জনগণ তাদের উৎখাত করে মুক্তি না দিচ্ছে। এই আপাদমস্তক সংকটগ্রস্ত ও সংঘর্ষে লিপ্ত, ক্যানসার সদৃশ শাসকশ্রেণী সমগ্র সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে চলেছে। এর আশু অপসারণই সমাজকে বাঁচাবার পথ। এই অবস্থা জনগণের বিপ্লবী সংগঠন ও সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য অবস্থাকে পরিপক্ক করে তুলেছে।

ফখরুদ্দিনের উপদেষ্টা সরকার হচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের আজ্ঞাবহ সরকার। এ সরকার হচ্ছে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের আওতায় সাম্রাজ্যবাদের সামরিক ব্যবস্থায় আত্মীকৃত, সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত মিত্র সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে প্রতিষ্ঠিত ও নিয়ন্ত্রিত। এ সরকার দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সংস্কারের সাম্রাজ্যবাদী নীলনক্সা বাস্তবায়ন  করে। এইসব সংস্কার এদেশকে উপনিবেশিক কায়দায় শোষণ-নিপীড়নের পথে চালিত করছে।

সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ এই নীলনকশার নিন্মোক্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে:

প্রথমতঃ তার পোষা কুকুরদের কামড়াকামড়ি মুগুরের বাড়ি দিয়ে ঠাণ্ডা করা, যাতে পুরো প্রতিক্রিয়াশীলদের শাসন ব্যবস্থাটা উচ্ছন্নে না যায়। এজন্য প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর ক্ষমতাবান নেতা-নেত্রীদের ধরে জ্বেলে ঢোকানো হয়।

দ্বিতীয়তঃ প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি, রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার ভগ্নদশা মেরামত ও শক্তিশালী করা, যাতে আবারো তা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম না হয়। বিশেষতঃ তার কেনা গোলামদের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ক্ষমতাশালী করা যাতে, পোষা কুকুরদের কামড়া কামড়ি লাগলে লাগাম টেনে ধরা যায়।

তৃতীয়তঃ রাষ্ট্রকে গণ প্রতিরোধ দমনে আরো সক্ষম করে তোলা। এজন্য জরুরী অবস্থা জারি করা হয়, নিপীড়ন ও দমন মূলক শ্রম ও সন্ত্রাস দমন আইন করা হয়, র‌্যাব-পুলিশকে ক্রস ফায়ারের নামে হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয় এবং এই গণহত্যা জোরালো করা হয়।

চতুর্থতঃ তীব্র শোষণ-নিপীড়ন ও লুণ্ঠনের যেসব প্রকল্প ও কর্মকাণ্ডের ফলে অর্থনৈতিক অবস্থা সংকট গ্রস্থ হয়েছে তা মেরামত করা এবং গণরোষের ভয়ে অথবা চরম দুর্নীতি ও অযোগ্যতার কারণে যে সব চরম গণবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক সংস্কার  ও প্রকল্পগুলো অতীতের সরকারগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়নি তা দ্রুত কার্যকর করা, যাতে এদেশকে অবাধ শোষণ-লুণ্ঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায় এবং তা আরো গভীর করা যায়।

এছাড়া তারা সামরিক, শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে।

এ সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা বাস্তবায়নের জন্য দেশবিক্রেতা ফখরুদ্দিন সরকার শাসকশ্রেণীর বর্তমান সংবিধানকে পদদলিত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। এজন্য তারা জরুরী অবস্থার নামে চরম ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করে।

ফখরুদ্দিন সরকার দেশের তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, পরিবহন, যোগাযোগ, শিল্প, কৃষি, ব্যাংক, বাণিজ্যসহ সমগ্র অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়। এজন্য সাম্রাজ্যবাদী নানা সংস্থার দেয়া নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।

রাজনৈতিক সংস্কারের নামে তারা সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত মিত্র সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে অন্যান্য নতজানু রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দুর্বল ও তাঁবেদার রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেখতে চায়। ইতিমধ্যে তারা নির্বাচন কমিশন, দুদক ইত্যাদির মাধ্যমে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তিকে পঙ্গু ও দুর্বল করে। জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতার দলিল হিসাবে তারা তথাকথিত “জাতীয় সংসদ” এ সরকার ব্যবস্থাসহ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেয়।

তারা বর্তমান পুরোনো উপনিবেশিক-সামন্তবাদী-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইনী, প্রশাসনিক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে সংস্কার দ্রুত এগিয়ে  নেয়। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধনের চেষ্টা করে। এর লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের উপনিবেশিক চরিত্রকে উপযোগী ও গভীর করা।

তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য বন্দর দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। সাম্রাজ্যবাদী সামরিক-রাজনৈতিক কৌশল “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে”র আওতায় ব্যর্থ রাষ্ট্র, নিরাপত্তা রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী ধারণাগুলোর অধীনে সন্ত্রাস দমন আইন প্রণয়ন করে। ইসলামী জঙ্গীবাদকে উসকে দিয়ে এর ক্ষেত্র আগে থেকেই প্রস্তুত করা হয় আর বর্তমান সরকার এই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রবেশের পথ প্রশস্ত করে। এর আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক তাৎপর্য রয়েছে। অন্যদিকে, এই আইন এবং এই যু্েদ্ধর অংশ হওয়ার অর্থ হলো এদেশে (আঞ্চলিক ক্ষেত্রে ও) সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ ও বিপ্লবের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরই নামান্তর।

সাম্রাজ্যবাদী নীলনক্সা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এই সরকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে দেশকে আরো গভীর সংকটে ফেলে। অর্থনীতিতে মন্দাভাব, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি জনজীবনে চরম অবনতি ঘটায়।

এ সরকার শ্রমিকদের কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করে। কৃষক হয় দিশাহারা। নারী নীতিমালার নামে প্রহসনের জন্ম দিয়ে মৌলবাদকে উসকে দেয়। নারীকে কোনঠাসা করে। পাহাড়ি জাতিসত্তাসহ সংখ্যালঘু জনগণের উপর দমন-পীড়ন চালায়। সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লাগে।

জরুরী অবস্থার মধ্যেও শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, শিক্ষক, ক্ষুদে ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরে জনগণ বারাবার জঙ্গী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এই আন্দোলন এবং দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিগুলোকে দমনে এ সরকার ফ্যাসিস্ট ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

জরুরী অবস্থার নামে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়। বাক-স্বধীনতা থাকে না। গণমাধ্যমগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়। সরকারের সাথে দুষ্ট আঁতাতে যুক্ত সুশীল সমাজ এবং তাদের গণমাধ্যম ও বিভিন্নমূখী প্রচারণা এই অবৈধ ফ্যাসিস্ট সরকারকে জাতির ত্রাণকর্তা, ধোয়া-তুলশীপাতা, দেশপ্রেমিক ইত্যাদি হিসাবে প্রচার করে। তারা এই সরকারের সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা প্রণয়নে জনমত সৃষ্টি করে।

ফখরুদ্দিন সরকার তাদেরই গড়া সংবিধানকে পদদলিত করে। উল্লেখ্য, এই সংবিধান ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের নিয়ন্ত্রণে, জনগণের কোনপ্রকার অংশগ্রহণ ছাড়া রচিত এবং পাকিস্তানি সামরিক ফ্যাসিস্টদের অধীনে নির্বাচিত ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের প্রতি অঙ্গীকারকারী, ভারতের কাছে দেশবিক্রিকারী জাতীয় বিশ্বাসঘাতক সাংসদদের দ্বারা অনুমোদিত। কিন্তু, এই সংবিধানও শাসকশ্রেণীর প্রতিটি সরকার পদদলিত করেছে।

ফখরুদ্দিন সরকার তাদের নিজেদের গড়া সংবিধানের আওতাতেও অবৈধ। তারা স্রেফ জরুরী আইনের বলে টিকে আছে। এভাবে দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাদের সামনে দু’টি পথ খোলা থাকে: হয় নির্বাচন দিতে হবে, নতুবা সামরিক আইন জারি করতে হবে।

ফখরুদ্দিন সরকার সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এমন অনেক কাজ করেছে যা তার আইনগত এখতিয়ারের বাইরে। ফলে এই সরকার এবং তার এখতিয়ার বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বৈধতা ছাড়া সমগ্র পরিকল্পনাই ভেস্তে যেতে পারে।

নির্বাচন দিলে তাদের সংকট হচ্ছে, আগামী সরকারকে দিয়ে এই সরকারের বৈধতা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে, আত্মরার্থে এই সরকারের লোকেদের আগামী সরকারে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের গৃহীত প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

ফখরুদ্দিন সরকার সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা বাস্তবায়ন নিশ্চিত ও কণ্টকমুক্ত করতে নির্বাচন ও সংলাপের আয়োজন করে। যার উদ্দেশ্য ছিল নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে দেশবিক্রি, অবৈধ ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ড করেছে তার বৈধতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতেও এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সুবন্দবস্ত করার লক্ষ্যে প্রতিক্রিয়াশীল উপদলগুলোর মধ্যে একটা আপোষ-রফা করা। শুধু তা-ই নয়, ফখরুদ্দিন সরকার ক্ষমতা সংস্কার এবং রাজনৈতিক সংস্কারের স্বার্থে নির্বাচনী আইন সংস্কার, সীমানা পূনঃ নির্ধারণ, উপজেলা নির্বাচন, মাইনাস ফর্মূলা, যোগ্যপ্রার্থী আন্দোলন, কিংস পার্টি গঠন, তাঁবেদার জাতীয় সরকার ফর্মূলা এবং জাতীয় সনদের আকারে ক্ষমতা-ভাগাভাগির রূপরেখা প্রদান করে।

সংবিধান সংশোধন, তাদের ক্ষমতা দখল ও কর্মকাণ্ডের বৈধতা প্রাপ্তি ও ক্ষমতার অংশীদারীত্ব নিশ্চিত করতে ফখরুদ্দিন সরকার তথাকথিত “জাতীয় সনদ” রচনা করতে চেয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত গোপন আঁতাতের শর্তাবলীর তালিকায় পরিণত হয়। সর্বশেষে, প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর সাথে আপোষরফা করে।

সুতরাং, ফখরুদ্দিন সরকারের অধীনে যে কোন সংলাপ, জাতীয় সনদ, নির্বাচন এবং গঠিত যে কোন ধরনের সরকার হলো ফখরুদ্দিন সরকারের অবৈধ, দেশবিক্রিকারী, ফ্যাসিস্ট, জাতীয় বিশ্বাসঘাতক কর্মকাণ্ডের বৈধতাদানের সংলাপ, সনদ, নির্বাচন ও সরকার। এসব কিছু হলো সাম্রাজ্যবাদী নীলনক্সা বাস্তবায়নের অংশ। এতে অংশগ্রহণ হলো জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা।

ক্ষমতার লোভে শাসকশ্রেণীর কিছু ছোটদল এবং সংশোধনবাদী দলগুলো ফখরুদ্দিন সরকারকে সমর্থন করে। এই সরকারের জাতীয় বিশ্বাসঘাতক, গণবিরোধী চরিত্র এবং এদের অবৈধ, দেশবিক্রিকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধী দলগুলোর সুস্পষ্ট কোন কর্মসূচি ও সংগ্রাম নেই। বরাবরের মত তারা মতা ও লুটের ভাগ নিয়ে দরাদরি করে, আপোষ ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতার পথ গ্রহণ করে।

এই অবস্থায় এদেশের জনগণের সামনে একটি মাত্র পথ খোলা রয়েছে; তা হলো সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদ এবং তাদের দালাল আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদকে উৎখাতের লক্ষ্যে বর্তমান দেশবিক্রেতা, স্বৈরাচারী সরকার ও সকল বিশ্বাসঘাতকদের উৎখাতের জন্য সংগ্রাম করা। জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা: একটি উন্নত, প্রগতিশীল, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, সংবিধান ও সরকার প্রতিষ্ঠার অসমাপ্ত বিপ্লবী কর্তব্য সম্পন্ন করা।

সমগ্র বাংলাদেশে আজ বিস্ফোরণ উম্মুখ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জনগণ আজ মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্পসারণবাদ এবং তাদের আজ্ঞাবহ সরকারের নির্মম শোষণ-লুণ্ঠন ও ফ্যাসিবাদী অত্যাচার থেকে মুক্তি চান।

কিছু বিশ্বাসঘাতক ছাড়া আনসার, বিডিআর, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীও এই অবৈধ সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট। কিছু বিশ্বাসঘাতক ছাড়া সরকারী, আধাসরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, শিল্প, ব্যাবসা-বাণিজ্যে যুক্ত জনসাধারনও এ দেশবিক্রেতা সরকারের প্রতি বিুদ্ধ।

বাংলাদেশের ছাত্র, শিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরাও এ সরকারের প্রতি বিুদ্ধ।

সারা দেশের শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদে চাকুরীজীবী, ক্ষুদে দোকানদার, হকার, জেলে, কামার, কুমার, তাতী এবং অন্যান্য পেশাধারী জনগণও এ স্বৈরাচারী সরকারের প্রতি ক্ষুদ্ধ।

বিভিন্ন জাতিগত, ধর্মীয় এবং ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগণ ও নারীরা এই ফ্যাসিস্ট সরকারের উপর বিক্ষুদ্ধ।

অর্থাৎ, পূর্ববাংলা তথা আজকের বাংলাদেশের সমগ্র জনগণ, শ্রেণী, দল, ভাষা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এ সরকারের উপর বিক্ষুদ্ধ।

এই ফ্যাসিস্ট সরকার এবং তাদের প্রভু মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের উৎখাতের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বতঃস্ফুর্ত সংগ্রাম চলছে। জনগণের এ সংগ্রামকে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ গঠন সবচাইতে সময়োপযোগী হয়েছে।

জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে:

আপনারা শ্রেণী, স্তর, দল, মত, ভাষা, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এ যোগদান করুন, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তাদের আজ্ঞাবহ দেশবিক্রেতা সরকারকে উৎখাত করুন, জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুন।

এদেশের শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে-আপনারা এদেশের সবচাইতে অগ্রগামী শ্রেণী, আপনাদের সংগ্রামী ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখে জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনের জন্য জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এ যোগদান করুন।

প্রকাশ্যে ও গোপনে কার্যরত দেশপ্রেমিক বামপন্থীদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে- আপনারা এদেশের জনগণের অংশ। জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে পারস্পরিক সংগ্রাম সমন্বিত করার জন্য জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এর সাথে যুক্তফ্রণ্টে যোগদান করুন।

বিভিন্ন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তি যারা এদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জন করতে ইচ্ছুক তাদেরকেও আহ্বান জানানো হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এর সাথে ঐক্যবদ্ধ হোন।

সংগ্রামী কৃষক জনসাধাণের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চে যোগদানের জন্য।

বিভিন্ন সামরিক বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ এবং অন্যান্য সশস্ত্র, আধা সামরিক বাহিনীর দেশপ্রেমিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এর প্রতি সক্রিয় সমর্থন ও যোগদানের জন্য।

দেশপ্রেমিক প্রাক্তন মুক্তিবাহিনী, সৈনিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এ যোগদানের জন্য।

দেশপ্রেমিক সরকারী, আধা সরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসা-বানিজ্য, শিল্পের সাথে জড়িতদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এ যোগদানের জন্য।

এদেশের ছাত্র-শিক্ষক, সাহিত্যিক, শিল্পি, বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য পেশাদারী জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এ যোগদানের জন্য।

এদেশের নারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এ যোগদানের জন্য।

জাতিগত সংখ্যালঘু, ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ-এ যোগদানের জন্য।

দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিগুলোর আত্মগত অবস্থা এখনও যথেষ্ট দুর্বল। স্বতঃস্ফূর্ত জনগণ অসংগঠিত। ফলে জনগণের সংগ্রাম প্রায় শূণ্য থেকে শুরু করে বিকশিত করতে হবে। তাই এটা দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে রূপ নেবে।  যে সব স্থানে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে শত্রু“র অবস্থান যেখানে দুর্বল সেখানে জনগণের প্রতিরোধ ও সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এভাবে ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্যদিয়ে দেশব্যাপী শত্রুর উৎখাত এবং জনগণের ক্ষমতা দখলের ভিত্তি প্রস্তুত করতে হবে।

জাতির এই দুঃসময়ে দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামের সূচনা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, সংবিধান ও সরকার গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত এ সংগ্রামের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের নীলনক্সা বাঞ্চাল করা; সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যে গোপন আঁতাত ও নীলনকশার নির্বচানের মাধ্যমে ক্ষমতারোহনকারী দেশবিক্রেতা সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে সংগ্রাম পরিচালনা করা।

এজন্য জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ রাজনৈতিক, প্রচার, কূটনৈতিকসহ সংগ্রামের সবরকম রূপ ও সর্বোচ্চ রূপের সংগ্রামের মাধ্যমে মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের আজ্ঞাবহ সরকারকে উৎখাতের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছে।

অতীতের ঐতিহ্যকে বজায় রেখে এদেশের জনগণ অবশ্যই সকল বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে কঠোর সংগ্রামে লেগে থাকবেন, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তাদের তাবেদারদের উৎখাত করে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন।