আজকাল জামাতিরা হুক্কাহুয়া রব তুলেছে যে, একাত্তরের ২৫ মার্চে অপারেশন সার্চ লাইট পরিচালিত হয়েছিল ভারতের এজেন্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে। তাদের কেউ কেউ “বিহারী গণহত্যাকে” এই সামরিক অ়ভিযানের কারণ হিসাবে দেখাতে চায়। এভাবে তারা পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের নির্মম গণহত্যা ও একাত্তরে তাদের ভূমিকার ন্যায্যতা প্রমাণ করতে চায়।
ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট হচ্ছে, জামাতের তৎকালীন মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের ২৩ মার্চ ১৯৭১ সালের সম্পাদকীয় স্বাধিকার আন্দোলনকে “স্বৈরতন্ত্র ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি” হিসাবে বর্ণনা করেছে। কেবল এই সম্পাদকীয়ই নয়, দৈনিক সংগ্রামের মার্চ মাসের সংখ্যাগুলো তন্নতন্ন খুঁজেও মার্চের গণঅভ্যুত্থানকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসাবে চিহ্নিত করা কোন কথা, বা বিহারি গণহত্যার কোন উল্লেখ পাবেন না। কেবল “সংগ্রাম” নয়, জামাত ও জামাতি নেতাদের ২৫ মার্চপূর্ব কোন বক্তৃতা-বিবৃতিতেও এসবের উল্লেখ মাত্র দেখা যায় না। বরং দেখা যায়, মুজিবের চার দফা মেনে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি। এমনকি তারা ভুট্টাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও মুজিবকে ঐক্যপন্থী দাবি করে।
অথচ ২৫ মার্চে স্বজাতির ওপর ইতিহাসের অন্যতম বর্বর গণহত্যা চালাবার পর জামাতকে পাক-সামরিক ফ্যাসিস্টদের ভারতের এজেন্ট দমনের বয়ানে ঠোঁট মেলাতে দেখা গেল। গণহত্যা শুরুর ১ সপ্তাহ না যেতেই, ৩ এপ্রিল গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামাত গং
গণহত্যাকারী টিক্কা খানের সাথে বৈঠক করে সর্বাত্মক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়।
কথায় আছে, মারবার আগে কুকরকে একটা খারাপ নাম দাও। দেখা গেল মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে জামাতিরা তাদেরই বর্ণিত জনগণের “স্বাধিকার আন্দোলন” কে ভারতীয় এজেন্টদের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা হিসাবে দাগাতে থাকে।
বলা আবশ্যক, আওয়ামী লীগ ছিল একটা বুর্জোয়া-সামন্ত সংসদীয় দল। তাদের রাজনৈতিক কৌশল ছিল গান্ধীবাদী দেনদরবার, অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মধ্যেই শোষণ-লুণ্ঠনের ক্ষমতার ভাগ আদায় করা। ফলে সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের কোন পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি তাদের ছিল না। ফলে এই স্বার্থপর শ্রেণী চরিত্রের দলটি জনগণকে বিপদের মধ্যে রেখে সবার আগে ভারতে পালিয়ে যায়। ভারত এই সুযোগ গ্রহণ করে। শেষপর্যন্ত ভারতের কাছে দেশবিক্রির বন্দোবস্ত করে তারা জাতীয়বিশ্বাসঘাতক যুদ্ধের হাতিয়ারে পরিণত হয়। কমরেড সিরাজ সিকদার তাই ১৯৭১ সালের অক্টোবরে দেশপ্রেমিকের বেশে ৬ পাহাড়ের দালালদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের এই বিশ্বাসঘাতকতা কি পূর্ব বাংলার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পাক ফ্যাসিস্টদের বর্বর গণহত্যাকে জাস্টিফাই করে?
লক্ষনীয় বিষয় হলো আওয়ামীলীগের ভারতাশ্রয়ী জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতার যুদ্ধ, ২৫ মার্চে শুরু হওয়া গণহত্যার কারণ নয়, ফলাফল। কিন্তু জামাতিরা ফলাফলকে কারণ হিসাবে উপস্থাপন করে, ঘৃণ্যতম অপরাধ করেও আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করে।

