মার্চের গণহত্যার পর আওয়ামী লীগের প্রতি অবিলম্বে (৩১ মার্চ) ভারত রাজনৈতিক সমর্থন জানালেও সামরিক সাহায্য দিয়েছিল বেশ পরে। এপ্রিলের মধ্যভাগে দেশের ভেতরে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়েছিল এবং তারপরই ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতে পালায়। ইন্দিরা মানেকশকে ঢাকা আক্রমণের বিষয়ে আলাপ করেছিলেন ২৭-২৯ এপ্রিল। ভারত থেকে সামান্য প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে ২ হাজারের মত গেরিলার প্রথম দলটি দেশে ঢুকেছিল জুনে। ভারতে সমর্থনে সেক্টর কমান্ডগুলো যুদ্ধে যায় জুলাই থেকে। ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে পরবর্তী মুক্তিবাহিনীর দলগুলো ঢুকেছিল আগস্টের মাঝামাঝি। ভারতীয় সৈন্যের প্রবেশ ঘটেছে আরো অনেক পরে, মূলত ডিসেম্বরে।
কিন্তু ২৫ মার্চের নির্মম গণহত্যার কয়েকদিনের মধ্যেই জামাত ৩ এপ্রিলেই পাক ফ্যাসিস্টদের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করে। তখন পর্যন্ত জনসাধারণ, আওয়ামী লীগ, বামপন্থারা, ইপিআর, পুলিশ এবং জিয়া, ওলিদের মত সামরিক কর্মকর্তারাই প্রতিরোধ করছিল। তা ছিল একেবারেি স্বতঃস্ফূর্ত। তাদের “অক্যুপেশন ফোর্স” বলার কোন সুযোগ নেই, কাউকে বলতে হলে তা কেবল পাক ফোর্সের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। তখন ভারতীয় বাহিনী দুরে থাক, তাদের সামরিক সাহায্যও তখন আসেনি।
গণহত্যা শুরু হয় ২৫ তারিখ। নির্দেশনা ও পরিকল্পনা করা হয় ১৮ মার্চ। ৩১ মার্চেও ভুট্টোর বক্তব্যে ভারতের কোন প্রসঙ্গ নেই। ২৩ মার্চের দৈনিক সংগ্রামেও রাজনৈতিক সংকটের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানকে দায়ী করা হয়েছে, সেখানে ভারতের কোন কথা নেই।
ভারতের পত্র-পত্রিকায় গণহত্যার খবর প্রকাশ হতে শুরু করলে, পাক গণহত্যাকারীরা আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য খবরগুলোকে উসকানি ও অপপ্রচার বলে প্রতিবাদ জানায়, যদিও “ভারতের দখলদার বাহিনী”-জাতীয় কোন বিষয় খোদ পাক সরকারও দাবি করেনি।
মূলত ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্ট পূর্ববাংলার আন্দোলনে সমর্থন জানাবার পর থেকেই পাক সরকার ভারতের বিরুদ্ধে আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলে এবং সীমান্তে অনুপ্রবেশের দাবি করে।
অথচ তাজ উদ্দিনের সাথে ইন্দিরার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ৩ তারিখ। হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ২৭ জন বাঙালী সামরিক কর্মকর্তা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা হাতে নেয় এপ্রিলের ৪ তারিখ। অর্থাৎ ভারতে লাখ লাখ শরণার্থী পালিয়ে আশ্রয় নিলেও ৩ তারিখ পর্যন্ত বুর্জোয়া রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা কেউই তখনো ভারতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগই স্থাপন করতে পারেন নি।
সুতরাং এটা বোঝা যায়, পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে দমন ও ধ্বংস করা এবং গণহত্যা চালাবার যৌক্তকিতা তৈরীর জন্যই ভারতীয় অনুপ্রবেশের অভিযোগ তোলা হয়েছিল এবং সেটা ফ্যাসিস্টদের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। অন্তত এপ্রিলের ৩ তারিখ পর্যন্ত এটা ছিল তাদের সামরিক আগ্রাসনের রাজনৈতিক মিথ্যা প্রোপাগান্ডা- এটুকু হলপ করেই বলা যায়।
কিন্তু দেখুন, ৩ তারিখেই গোলাম আযমসহ জামাতের নেতারা ” ঠান্ডা মাথার জল্লাদ” বলে খ্যাত রাও ফরমান আলী, টিক্কা খানসহ পূর্ববাংলার নিরস্ত্র জনগণের ওপর গণহত্যার পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী পাক ফ্যাসিস্ট সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে, তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল। ধরে নিতে পারি, সিদ্ধান্তটি আরো আগেই তারা নিয়েছিল।
১০ এপ্রিল জামাত নেতা গোলাম আযমই পাক সামরিক বাহিনীর সহযোগী হিসাবে রাজাকার বাহিনী গঠনের প্রস্তাব দেয়। এই বাহিনী সরকারি অর্থে পরিচালিত হত, তাদের সদস্যরা বেতন পেত।
লক্ষ্য করুন, ভারতবিরোধী পাক ফ্যাসিস্টদের মিথ্যা রাজনৈতিক-সামরিক বয়ানকে হাতিয়ার করেই
জামাতসহ কয়েকটি দল পূর্ববাংলার মুক্তিকামী জনগণের তাজা রক্ত মাড়িয়ে তাদেরই খুনী গণহত্যাকারীদের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, পাক সামরিক বাহিনীর গণহত্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন জানিয়েছিল।
এবং অচিরেই পাক বাহিনীর অক্সলিয়ারি ফোর্স রাজাকার, পরে আলাবদর আল শামস গঠন করে সামরিকভাবে এই গণহত্যায় লিপ্ত হয়েছিল। এভাবে তারা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী ও তাদের ফ্যাসিস্ট সামরিক বাহিনীর সহযোগী এবং পূর্ববাংলার জনগণের ওপর পরিচালিত গণহত্যার দোসরে পরিণত হয়েছিল। প্রোপাহান্ডা ছাড়া ভারতের আগ্রাসনের সাথে এই মিরজাফরিতে লিপ্ত হওয়ার বাস্তবতা তখন ছিল না।
সুতরাং মিনা ফারাহ্-র মত জামাতি প্রোপাগান্ডাকারীরা যা বলছে তা নতুন কিছু নয়। তারা একাত্তর সালে পাক ফ্যাসিস্টদের গণহত্যাকারী রাজনৈতিক-সামরিক বয়ান যা গণহত্যা ও মুক্তিকামী জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ দমনকে জাস্টিফাই করতে ব্যবহার করেছিল- তারই পুনরাবৃত্তি করছে। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের পরবর্তী আগ্রাসনের আড়ালে তারা তাদের পূর্ববর্তী জঘন্যতম অপরাধ লুকাতে চেষ্টা করছে। এরা এখন ইতিহাসকেও হত্যা করতে চায়।

