মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ গত সাড়ে তিন দশক যাবত বাজার অর্থনীতিমুখী “রাষ্ট্রের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের”( Restructuring of the State) যে প্রয়াস চালাচ্ছে, “জুলাই সনদে” সেই পুনর্বিন্যাসকে সবচেয়ে সর্বাঙ্গীণ ও গভীরতর করা হয়েছে।
১৯৯০ পরবর্তী ও ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তৃতীয় শক্তির সরকার রাষ্ট্র ও রাজনীতির যে “নয়াউদারতাবাদী” পুনর্বিন্যাস সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানের সুযোগে গঠিত সেনাসমর্থিত তৃতীয় শক্তি ও ধর্মবাদী শক্তির ইন্টারিম সরকার মূলতঃ সেই অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পাদনের দায়িত্ব নিয়েছে।
উপনিবেশিক রাষ্ট্রের উত্তরাধিকারসহ আইযুব খানের মত “মডার্নাইজিং জেনারেলদের” হাতে নয়া উপনিবেশিক রাষ্ট্রচালিত প্রবৃদ্ধিমুখী অর্থনীতির কারণে একচেটিয়া অর্থনীতির উপযোগী এক কেন্দ্রীভূত একচেটিয়া রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল পাকিস্তানে।
রুশ-ভারতের দালাল মুজিবের রাষ্ট্রচালিত পুনর্বণ্টনের অথনীতি, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া, আনুগত্যহীন আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরতা সরকার ব্যবস্থাকে করপোরেটিভিস্ট বাকশালের দিকে চালিত করে। তাতে মার্কিন অনুগত আমলা বুর্জোয়াদের সাথে রুশ-ভারত অনুগত দালাল বুর্জোয়াদের দ্বন্দ্ব ঘনীভূত হয়। ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুগত একমাত্র সক্ষম শক্তি হিসাবে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ভারতবিরোধী ও ধর্মবাদী শক্তিগুলোর সমন্বয়ে সেনাশাসন বলবৎ হয়। সংবিধানে মুজিববাদ ও রুশ-ভারতের আনুগত্যের চিহ্ন সরিয়ে ফেলে সেনা সমর্থিত সীমিত “গণতান্ত্রিক” সংস্কার আনে জিয়া। কিন্তু তা এরশাদের সামরিক শাসন ফিরিয়ে আনে।
অর্থাৎ, ১৯৪৭ থেকে ১৯৯০ অবধি রাষ্ট্রের সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক একচেটিয়া রূপেই বিকশিত হয়।
অন্যদিকে, তৃতীয় বিশ্বে রাষ্ট্রচালিত প্রবৃদ্ধিমুখী অর্থনীতি একদিকে “বাইশ পরিবার” অন্যদিকে “সোনার বাংলাকে শ্মশানে” পরিণত করে। এসব দেশে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকট থেকে বিপ্লবী সংকট দেখা দেয়। ১৯৭০-এর দশকে সাম্রাজ্যবাদ তেল সংকট ও “মন্দা-ষ্ফীতি” -র কবলে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় সাম্রাজ্যবাদকে সংকট উত্তরণে রিগান ও থ্যাচারের হাতে নিওলিবারেলিজ ও মার্কেট ফান্ডামেন্টালিজমের উৎপত্তি ঘটে। রাষ্ট্রচালিত একচেটিয়া থেকে বাজারচালিত প্রবৃদ্ধি হয়ে ওঠে মূল মন্ত্র। দেশে দেশে পুঁজির লাভজনক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বাজারমুখী অর্থনীতি তৈরীর জন্য “কাঠামোগত সমন্বয় সংস্কার” আরোপ করা হয়।
১৯৮৫ সাল থেকে বৈদেশিক অনুদান ও ঋণের বিনিময়ে “কাঠামোগত সমন্বয় সংস্কার” গ্রহণে এরশাদ সরকারকে চাপ প্রয়োগ চলতে থাকে। কিন্তু দীর্ঘপরিক্রমায় গড়ে ওঠা কেন্দ্রীভূত একচেটিয়া আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার সুবিধাভোগীরা ঋণ ও অনুদান গিলে খেলেও সংস্কারে দীর্ঘসূত্রিতা অবলম্বন করতে থাকে।
এভাবে ১৯৯০-এর দিকে অর্থনীতিকে বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক করার স্বার্থে অর্থনীতির মালিকদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত একচেটিয়া রাজনৈতিক ক্ষমতার বদলে প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রয়ানের নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৯০ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তিত হলেও সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা অটুট থাকে। ফলে উদ্ভব ঘটে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের।
এ সময়কালে রাষ্ট্রকে ঋণ অনুদান কমিয়ে তার বেসরকারি রূপ এনজিও ও সিভিল সোসাইটিকে বিকশিত করা হয়। বিরাজনীতিকরণ উৎসাহিত করা হয়। সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ইত্যাদি নামে রাষ্ট্র সংস্কারের চেষ্টা অব্যহত থাকে।
১৯৯০ সালের পর গার্মেন্টস, রেমিট্যান্সের প্রভাবে প্রবৃদ্ধি ৫% এ উন্নীত হয়। কিন্তু দুর্নীতির কারণে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত পিছিয়ে পড়া ২০০৪ সালে অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনে। তার সাথে যুক্ত হয় নির্বাচনে কারসাজিজনিত রাজনৈতিক সংকট।
শেষাবধি, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকটের সুযোগে ১/১১/২০০৭ মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশে সেনা সমর্থিত এনজিও-সিভিল সোসাইটি সরকার জবরদস্তি নিওলিবারেল সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। তখনই তারা “মাইনাস টু ফর্মুলা” প্রয়োগ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-র দ্বিদলীয় একচেটিয়া রাজনীতি ভেঙ্গে সংস্কারবাদী লীগ, দল ও ড. ইউনুসের নেতৃত্বে কিংস পার্টি তৈরী করে ও ছোট দলগুলোকে সাথে নিয়ে জাতীয় সনদ প্রণয়ন ও জাতীয় সরকার গঠন করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের সমর্থন না থাকায়, শাসক শ্রেণীর সংস্কারবিমুখ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো আগস্ট আন্দোলনের সুযোগে পাল্টা আঘাত করে সরকারকে নড়বড়ে করে দেয় এবং আপোসরফার মধ্যদিয়ে ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য করে। বিএনপি-র ভঙ্গুর দশা ও তৃতীয় শক্তির পরাজয়ের সুযোগ গ্রহণ করে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগ “সীমিত গণতন্ত্র বেশি উন্নয়ন” মডেলে অবকাঠামো সংকট মোকাবেলা করে দেশি-বিদেশি শাসক শ্রেণীর আস্থাধন্য হয়। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত উপাদানকে দলীয়করণ করে অঘোষিত বাকশাল তৈরী করে। একচেটিয়া রাজনীতি ও একচেটিয়া অর্থনীতি চরম আকার ধারণ করে। কিন্তু একদিকে আওয়ামী লীগের ভারতের তাঁবেদারি, ফ্যাসিবাদ ও মেগাদুর্নীতির কারণে ঘনীভূত অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকট, চীনের সস্তা ঋণের প্রতি ঝোঁক অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার গুরুতর ফাটল দেখা দেয়া, ভারতের সাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির কারণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বাংলাদেশে প্রভাব একচেটিয়া করার আকাঙ্ক্ষা আওয়ামী লীগের পতন তরান্বিত করে।
মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ বাজারমুখী ও সহজে মেনিপুলেশনে সক্ষম রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে ইচ্ছুক। যেখানে অন্তত পুরনো বাজারবিমুখ রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলেও কাঠামোগতভাবে একচেটিয়া হয়ে উঠতে অপারগ এবং বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতাকে মেনিপুলেট করে পুঁজি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সহজে হাসিল করা সম্ভব হবে।
মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ গণতন্ত্রায়ণের জন্য এনজিও, সিভিল সোসাইটি সংগঠন, সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, প্রচারক-প্রভাবক, বুদ্ধিবৃত্তি গড়ে তোলায় ইনস্ট্রুমেন্টগুলোকে সক্রিয় রাখে। জেফরি স্যাকসসহ কিছু সূত্র যে ২৪-এর নির্বাচনকালে
কালার রেভ্যুলেশনের মাধ্যমে রেজিম চেঞ্জের অভিযোগ তুলেছে, সেটা অমূলক নয়। তবে ১/১১-এর অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনের প্রশ্নে ধর্মবাদী শক্তিগুলোকে কাছে টানা হয়েছে। ধর্মবাদী শক্তিগুলো নিজেদের বিকাশের জন্য এই সুযোগ লুফে নিয়েছে। পরিচয় গোপন রেখে সরকারকে কোনঠাসা করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির কাজে কোটা আন্দোলনকে তারা ব্যবহার করেছিল।
কোটা আন্দোলনে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়ন জনগণের বিক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে চালিত করলে কালার রেভল্যুশনের নানা উপাদান নানা দিক থেকে সক্রিয় হয়। আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ায় জামাত-শিবিরের নেতৃত্বে ধর্মবাদী শক্তিগুলো বেনামে আন্দোলনের নেতৃত্ব সংস্থা দখল করে নেয়। তাদের মদদ দেয় মার্কিন ও ইউরোপীয় নানারঙের এনজিও ও সিভিল সোসাইটি সংগঠন।
ফলে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের ন্যায়সঙ্গত বিরত্বপূর্ণ সংগ্রাম- মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্বিন্যাসকে গভীরতর করা, ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ক্ষেত্রে তাদের তাঁবেদারি এবং ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট শক্তির তাৎপর্যপূর্ণ উত্থান নিশ্চিত করার পথে চালিত হয়। এসব নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান ও আইনগতভাবে রাষ্ট্র ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে জুলাই সনদে।
সনদে মূলত প্রেসিডেন্ট, সংসদ, বিরোধী দল, সংসদ সদস্য, বিচার বিভাগ, সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর ক্ষমতা বাড়িয়ে তাদের ওপর নির্বাহী বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাকে কাটছাঁট করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে সিভিল সোসাইটি ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা, কমানো হয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা, বাড়ানো হয়েছে ছোট দলগুলোর ক্ষমতা। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী মূলনীতির জায়গায় স্থান পেয়েছে সিভিল সোসাইটির লিবারেলিজম আর ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদের মিশ্রণ।
সনদ তৈরী করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। তিনজোটের রূপ রেখার পরিণতি ও পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারে প্রবল অনীহার কথা বিবেচনায় নিয়ে ইন্টারিম সরকার চাইছে সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে নির্বাচিত সরকারের ওপর গণভোটের মাধ্যমে একটা আইনী বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে এবং জনগণের মাঝে এই সংস্কারগুলোর পক্ষে সম্মতি তৈরী করতে।
অবশ্য শেষপর্যন্ত এসব সংস্কার কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা এখনো শাসক শ্রেণীর উপদলগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করছে।
সাম্রাজ্যবাদ আরোপিত “সরকার ব্যবস্থার’ এই সংস্কার নয়া উপনিবেশিক রাষ্ট্রকে অধিকতর উপযোগী করে তুলবে মাত্র। দেশের শ্রমিক-কৃষক-জনগণের ওপর মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালালদের একনায়কত্বের প্রধান হাতিয়ার হিসাবে এই নয়া উপনিবেশিক-সামন্ত আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি আরো সংহত হবে। সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের শোষণ-নিপীড়ন আরো গভীরতর হবে।
সুতরাং শাসক শ্রেণীর দুই রাজনীতি- একদিকে পুরনো একচেটিয়া রাজনীতি অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত উদারতাবাদী-ধর্মবাদী রাজনীতি; একদলীয় লুটপাট আর সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত বহুদলীয় লুটপাট। সুতরাং এখানে জনগণের পক্ষ বাছাই করার কোন সুযোগ নেই। এদের কারো পক্ষে আমাদের সম্মতি উৎপাদন করার সুযোগ নেই।
শাসক শ্রেণীর শোষণ-লুণ্ঠন-নিপীড়নের হাতিয়ার রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরামতে জনগণের ফায়দা নেই। আমাদের দরকার এই নিপীড়নের যন্ত্র চুরমার করে জনগণের ক্ষমতা কায়েম করা। আসুন, সে লক্ষ্যে স্থির হই, এগিয়ে যাই।


https://shorturl.fm/Cz8OH
https://shorturl.fm/H5fM0
https://shorturl.fm/Iz08b
https://shorturl.fm/2gIu7
https://shorturl.fm/x6cUn
https://shorturl.fm/3q0Ny
https://shorturl.fm/2NrZs
https://shorturl.fm/ZLctT
https://shorturl.fm/CQfc8
https://shorturl.fm/7YBJV
https://shorturl.fm/3jc3u
https://shorturl.fm/Qq5Iy
https://shorturl.fm/wcllp
https://shorturl.fm/rTeho
https://shorturl.fm/HD8Ag
https://shorturl.fm/DYrwP
https://shorturl.fm/EUyj5
https://shorturl.fm/jUgGX
https://shorturl.fm/2eHBF
https://shorturl.fm/it8p1
https://shorturl.fm/mhk7d
https://shorturl.fm/2IBHs
https://shorturl.fm/vIBG6
https://shorturl.fm/NRGdX
https://shorturl.fm/fNjv1
https://shorturl.fm/u8s7t
https://shorturl.fm/7e9Md
https://shorturl.fm/DjWTx
https://shorturl.fm/Xwswd
https://shorturl.fm/RFyQe
https://shorturl.fm/Wfna0
https://shorturl.fm/7ew0Q
https://shorturl.fm/ODlSN
https://shorturl.fm/8nFen
https://shorturl.fm/qTpjX