মহান মে দিবস: শাসক শ্রেণীর প্রবঞ্চনা এবং ইতিহাসের শিক্ষা

আগামী ১ লা মে সারা দুনিয়ার মত বাংলাদেশেও মহান মে দিবস পালিত হবে। এদিন অনেক কারখানায় ছুটি থাকবে। নানা ধরণের শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে শ্রমিকরা ব্যান্ড পার্টি আর গাড়িতে সাউন্ডবক্স বাজিয়ে ধুমধারাক্কা মিছিল করবে। এলাকার প্রভাবশালী শ্রমিক নেতাদের নেতৃত্বে খিচুড়ি বা বিরিয়ানি পাকিয়ে চলবে খাওয়া-দাওয়া। স্ট্যাডিয়াম ভাড়া করে বিজিএমই ধরণের মালিক সংগঠন থেকে আয়োজন করা হবে ব্যান্ড শো। মন্ত্রী বনে যাওয়া শ্রমিক নেতাদের সভাপতিত্বে নেতা-কর্মীরা বিশাল শ্রমিক জমায়েত করবে। সেখানে ‌‌“মালিক শ্রমিক ভাই ভাই-উন্নয়নের সীমা নাই” জাতীয় স্লোগান লেখা টি-শার্ট, ক্যাপ পরে শ্রমিকরা হাজিরা দেবে। শ্রমিকদের কাছে এখন মে দিবস মানে শ্রমিকদের জন্য এক বিশেষ ছুটির দিন, যে দিন তারা বড় ভাইদের নির্দেশে মিছিল-সমাবেশ, হৈচৈ, ধুম-ধারাক্কা, ফুর্তি করে খিচুরি-বিরিয়ানি খেয়ে কাটিয়ে দেবে। দেখেশুনে মনে হবে, এদেশের মালিক-শ্রমিকের মত সুখী সংসার দুনিয়ার আর কোথাও নেই।

মালিক-শ্রমিকের এ সুখী-সুখী মুখোসের আড়ালে চিত্রটা আসলে কেমন?

বাংলাদেশের প্রায় ৫০ লক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিক আর ১ কোটি প্রবাসী শ্রমিকদের দিকে তাকালেই সারাদেশের শ্রমিকদের অবস্থা পরিষ্কার হয়ে যাবে। সস্তা শ্রম আর কর্মপরিবেশের বদলে এদেশের গার্মেন্ট মালিকরা আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোষাক রপ্তানিকারক আর শ্রমিকরা পায় বিশ্বের সর্বনিম্ন মজুরি। ধনী থেকে আরো ধনী হওয়ার উন্মত্ততার  বলি হয়েছিল রানাপ্লাজার কয়েক হাজার শ্রমিক, যা বিশ্বের বৃহত্তম শ্রমিক হত্যাকাণ্ডগুলোর অন্যতম। রানাপ্লজা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ছিল তাজরিন, স্পেকট্রাম, হামিমসহ অসংখ্য শ্রমিক হত্যাকাণ্ডেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। কিছুদিন আগে টেম্পাকো এবং পর ৩দিন আগে দিনাজপুরে বয়লার বিস্পোরণে ১৩জন শ্রমিকের মৃত্যু মালিক শ্রেণীর নৃশংশ শোষণেরই ফল। একে আমরা শ্রমিক হত্যাকাণ্ডই বলব কারণ মালিকদের মুনাফা ও প্রতিযোগীতা সক্ষমতা রক্ষার জন্যই শ্রমিকদের এভাবে বলি দেয়া হচ্ছে। 

মালিকরা যখন একটার জায়াগায় ৫টা কারখানার মালিক হচ্ছে তখন শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি ১৯৬৯ সালের তুলনায় অর্ধেকের নীচে নেমেছে। যদিও কারখানা বাড়ায় কাজও বেড়েছে। এখন স্বামী-স্ত্রী ছেলে-মেয়ে সকলে কাজ করে সংসার চালাতে হয়। তা না হলে এ মজুরিতে সংসার চালানো সম্ভব হতো না। তবুও সংসার চালাতে হিমসিম খাওয়া শ্রমিকরা সেই কারখানাতেই চাকরি নিতে চান, যেখানে প্রতিদিন এমনকি ছুটির দিনেও ওভারটাইম আছে। হায়, মানুষের মত জীবন যপানের জন্য ৮ঘন্টা কর্মদিবসের দাবীতে গড়ে ওঠা শ্রমিক আন্দোলনই ১৮৮৬ সালে মে দিবসের সৃষ্টি করেছিল । আর ১৩১ বছর পর এদেশে শ্রমিকের ৮ ঘন্টা কর্মদিবসের অধিকার এক পরিহাসে পরিণত হয়েছে। আজ ন্যুনতম বাঁচার প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে শ্রমিক তার শরীর-স্বাস্থ্য, মানুষের মত জীবন উপেক্ষা করে পশুর মত খেটে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ শ্রমিক যখন মজুরি বাড়ানোর দাবী তোলে-তখন মাস্তান, র‍্যাব, শিল্প পুলিশ, গোয়েন্দা দিয়ে দমন করা হয়। মারধর, হুমকি, ছাটাই, হামলা, মামলা, জেল-জুলুম এমন কি গুলি চালাতে দ্বিধা করা হয় না। কিছুদিন আগে সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে ন্যুনতম বেতন ১৬ হাজার টাকার দাবীতে ৬০টির বেশি কারখানার শ্রমিকরা ধর্মঘটে গিয়েছিল। সরকার এ আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করে। আন্দোলনে কারো সামান্যতম সম্পৃক্ততা পেলেও তাকে জেলে পাঠিয়েছে। অন্য নেতাদের আপোষ করতে বাধ্য করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, গতবার না কি তিনিই বেতন বাড়ানোতে মালিকদের রাজী করিয়েছিলেন। শ্রমিকরা আন্দোলন করলে সে বেতন তিনি কমিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের প্রশ্ন, সব জিনিসের দাম বিক্রেতারা ঠিক করে, তবে শ্রমিকরা কেন তার শ্রমের দাম নিজেরা ঠিক করতে পারবে না? কেন শ্রমিকের মজুরি প্রধানমন্ত্রীর মর্জির উপর নির্ভর করবে?(আসলে বাংলাদেশের সকল সরকার প্রধানের মত ইনিও মালিক শ্রেণীরই স্বার্থরক্ষক ছাড়া কিছু নন)

সারা দুনিয়াতে ১৫০ বছর আগেই শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করা আইনত স্বীকৃত অধিকার। ইউনয়িনের মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের শ্রমশক্তির দাম, কর্মপরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার জন্য মালিকদের সাথে যৌথভাবে দরকষাকষি করে। কিন্তু বাংলাদেশে ইপিজেডগুলোতে ইউনিয়ন আইনত নিষিদ্ধ। আর দেশের মধ্যে প্রাইভেট কোম্পানীগুলোতে মালিকরা রাষ্ট্রের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অবৈধভাবে দমন-পীড়নের শ্রমিকদের ইউনিয়ন করতে সবরকম বাধা সৃষ্টি করে চলেছে। এদেশের মালিক শ্রেণী শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়াকে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ মনে করে। কারণ এতে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি ও কাজের পরিবেশ দাবী করলে তা মেটাতে গিয়ে-তারা রপ্তানি সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়বে। এভাবে এদেশের মালিক শ্রেণী রাষ্ট্রের মদদে শ্রমিকের মতপ্রকাশ, সংগঠন, সমাবেশ, সংগ্রাম করার গণতান্ত্রিক অধিকার আইন বলে ও বেআইনী পথে দমন করছে। 

গার্মেন্ট কারখানায় তাই কোন শ্রমিক বেশি দিন চাকরি করতে চায় না। তারা ভাবে কিছুদিন কাজ করে, কিছু নগদ টাকা জমিয়ে গ্রামে ফিরবে বা বিদেশে পাড়ি জমাবে। কিন্তু অতি কম মজুরির কারণে যথেষ্ট টাকা জমানো যায় না, এ নরক থেকে তাদের মুক্তিও মেলে না। এ শ্রমিকবহুল শিল্পখাতে মজুরি কম হওয়ায়, অন্যান্য খাতেও তার প্রভাব পড়ে। ফলে দেশে এর চেয়ে বেশী মজুরি ও বালো কর্মপরিবেশের কাজ না জোটাই শ্রমিকরা এ নরকেই জীবন পার করতে বাধ্য হয়। আর কেউ সুযোগ পেলে একটু উন্নত জীবনের আশায়, প্রয়োজনে জীবনের ঝুকিঁ নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিতে চায়। কিন্তু সেখানেও মুক্তি মেলে না। কিছুদিন আগে থাইল্যান্ডে পাচার চক্রের খপ্পরে পড়া শত শত জোয়ানের গণকবর পাওয়া গেছে। কত জনের সাগরে সমাধি হয়েছে তার হিসাব নেই। পরদেশে এ দেশের ১ কোটির নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা দাস-দাসীর মত খেটে দেশে টাকা পাঠায় –তা দিয়ে এক শ্রেণীর লোকের ‘উন্নয়ন’ ঘটে ।

মালিক শ্রেণী এ রাক্ষুসে শোষণ ও নারকীয় নির্যাতনকে আড়াল করতে চায়। তারা চায় মালিক শ্রেণীর শোষণ-নিপীড়ণের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম ও সংগঠন গড়ে তোলার ইতিহাস চাপা দিতে। কারণ তা জানলে শ্রমিকরা মুক্তির দিশা পাবে, পাবে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা। আর এ কারণেই মহান মে দিবসের প্রকৃত ইতিহাসকে মালিক শ্রেণী ভয় পায়। তারা এর ইতিহাস ও তাৎপর্যকে বিকৃত করে।

মহান মে দিবসের ইতিহাস হল শ্রমিক শ্রেণীর বিরোচিত সংগ্রামের ইতিহাস

১৬ শতক থেকেই ইউরোপে কারখানাকেন্দ্রিক নগরায়ন বাড়তে থাকে। কৃষক-কারিগররা গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে কাজ নেয় শহরের কারখানাগুলোতে। তখনও কারখানার যন্ত্রপাতি ছিল পুরনো ধাচেঁর। বিদ্যুৎ দুরে থাক বাষ্পশক্তিও তখন ছিল না। ১৭৬০ হতে ১৮২০ সালের মধ্যে বাষ্পশক্তির ব্যবহারসহ মেশিন ও প্রযুক্তির বিরাট উন্নতি ঘটে। একে বলা হয় শিল্প বিপ্লব। শিল্প বিপ্লবের কারণে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৮১১-১৬ সালে ইংল্যান্ডে শ্রমিকরা মেশিনপত্র ভেঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ১৮২০ সালে স্কটল্যান্ডে ৬০হাজার শ্রমিক ধর্মঘট করেছিল। ১৮১০-এর দিক থেকেই ক্ষণস্থায়ী অনেক ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু তখন ট্রেড ইউনিয়ন ছিল আইনত নিষিদ্ধ। তখন আন্দোলনগুলো হতো মুলত মুজরি বাড়ানোর দাবীতে। কিন্তু যখনই শ্রমিকরা দাবি দাওয়ার কোনো দলিল রচনা করেছেন, কাজের ঘন্টা কমানো এবং সংগঠনের অধিকারের দাবীও জোরের সাথে তুলেছেন।

প্রস্তুতিকাল

“সূর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত”- এই ছিল তখনকার দিনের কাজের ঘন্টা। ১৮শ সালে শুরুতেই আমেরিকার শ্রমিকরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। চৌদ্দ, ষোল এমনকি আঠারো ঘন্টার কাজের দিনও তখন চালু ছিল।

১৮২০ থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত কাজের ঘন্টা কমাবার দাবিতে ধর্মঘটের পর ধর্মঘট হয়। দৈনিক দশ ঘন্টা কাজের নিয়ম চালু করবার সুনির্দিষ্ট দাবিও অনেক শিল্পকেন্দ্রে তোলা হয়। ইংল্যান্ডের প্রথম ট্রেড ইউনিয়নও দু’বছর আগে প্রতিষ্ঠিত  হয়। ১৮২৭ সালে ফিলাডেলফিয়ায় দশ ঘন্টা কাজের দাবিতেই গৃহনির্মাণশিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের এক ধর্মঘটের মাধ্যমে দুনিয়ার প্রথম ট্রেড ইউনিয়নের জন্ম হয় । 

কয়েকটা শিল্পে ১০ ঘন্টা কর্মদিবসের দাবি স্বীকৃত হবার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রমিকরা দৈনিক আট-ঘন্টা কাজের নিয়ম চালু করবার দাবি তোলেন। ১৮৫০ সাল থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে শ্রমিক ইউনিয়ন গড়বার ব্যাপারে প্রবল কর্মোদ্দীপনা দেখা দেয়, তারফলে এই দাবিও ক্রমশ জোরদার হতে থাকে। কাজের ঘন্টা কমানোর এই আন্দোলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই হয়েছিল, তা নয়, উদীয়মান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেখানেই শ্রমিকেরা শোষিত হচ্ছিলেন, সেখানেই এই আন্দোলন জন্ম নিয়েছিল। তাই দেখা যায় যে, অষ্ট্রেলিয়ার মতো সুদূর দেশের গৃহ-নির্মাণ শ্রমিকরাও আওয়াজ তুলছিলেন “আট-ঘন্টা কাজ, আট-ঘন্টা আমোদ-প্রমোদ, আট-ঘন্টা বিশ্রাম”, এবং এই দাবি আদায় করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। 

আমেরিকায় ১৮৬৬ সালের ২০ শে আগস্ট ষাটটি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধি বালটিমোরে মিলিত হয়ে ‘ন্যাশনাল লেবর ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করলেন। জাতীয় সংগঠন গড়ার নেতা ছিলেনঢালাই শ্রমিকদের ইউনিয়নের নেতা উইলিয়ম এইচ সিলভিস। তরুণ সিলভিস লন্ডনস্থ শ্রমিক শ্রেণীর প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। যার নেতা ছিলেন শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির পথ-প্রদর্শক মহামতি কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। 

‘ন্যাশনাল লেবর ইউনিয়ন’- এর প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে যে সম্মেলন ডাকা হয়েছিল তাতে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ঃ “এই দেশের শ্রমিকশ্রেণীকে পুঁজিবাদীদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করবার জন্য এই মুহূর্তের প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন হলো এমন একটি আইন পাশ করা- যার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত রাজ্যেই সাধারণ কাজের দিন হবে আট-ঘন্টা। এই মহান লক্ষ্য পূর্ণ করার পথে সমগ্র শক্তি নিয়োগ করবার সঙ্কল্প আমরা গ্রহণ করছি।” 

‘ন্যাশনাল লেবর ইউনিয়ন’ এর আন্দোলনের ফলে অনেক ‘আট ঘন্টা-শ্রম সমিতি’ স্থাপিত হয়। এই সংগঠনের  রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার চাপে অনেকগুলো রাজ্য সরকারই,  কেবল সরকারী কর্মক্ষেত্রে আট ঘন্টা কাজের দিনের দাবি মেনে নেয়। 

১৮৭৭ সালের মহান ধর্মঘট সংগ্রামগুলোতে লক্ষ লক্ষ রেল ও ইস্পাত শ্রমিক কর্পোরেশন এবং সরকারের ধর্মঘট ভাঙা সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়ে যান। এই সংগ্রাম সমগ্র শ্রমিক আন্দোলনের উপর ছাপ রেখে যায়। দেশজোড়া ভিত্তিতে আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণীর এই প্রথম বড়ো রকমের গণ-সংগ্রাম। যদিও রাষ্ট্রপুঁজির সম্মিলিত শক্তির কাছে তাঁদের পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছিল, তবুও এই সংগ্রামের ভিতর দিয়েই শ্রেণীগত অবস্থান সম্পর্কে অধিকতর সচেতন, অধিকতর সংগ্রামী চেতনাসম্পন্ন , অধিকতর দৃঢ়িপ্রতিজ্ঞ এক শ্রমিকশ্রেণীর অভ্যুদয় আমেরিকায় ঘটে। একদিক থেকে এই অভ্যুদয় পেনসিলভ্যানিয়ার কয়লাখনি মালিকদের অপচেষ্টার জবাব; কয়লাখনির এই মালিকরা ১৮৭৫ সালে খনি অঞ্চল থেকে খনিশ্রমিকদের সংগঠন উচ্ছেদ করবার অভিসন্ধিতে দশ জন সংগ্রামী খনিশ্রমিককে (মলি ম্যাগুইরাস) ফাঁসিকাঠে লটকিয়েছিল। 

আমেরিকায় ১৮৮০ দশকে শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাজারের অভুতপূর্ব বিকাশ ঘটে। সেই সঙ্গে কিন্তু ১৮৮৪-৮৫ সালে মন্দার প্রাদুভার্ব দেখা দেয়;। কাজের ঘন্টা কমানোর আন্দোলন এই সময়কার বেকারী ও দুঃসহ দুরবস্থার ফলে আরও জোরদার হয়ে ওঠে।

মে দিবসের আন্দোলন

১৮৮৪ সালে আমেরিকার শিকাগোতে একটি তরুণ শ্রমিক সংগঠন ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবর’ তাদের চতুর্থ সম্মেলনে এ মর্মে প্রস্তাব পাশ করে যে “১৮৮৬ সালে ১লা মে তারিখ থেকে দৈনিক আট-ঘন্টাকেই কাজের দিন বলে আইনত গণ্য করা হবে।‍‍‍” যদিও এ সংগঠনটি মাত্র ৫০ হাজার শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করতো। তাই একে আইন হিসাবে জারি করার কর্তৃত্ব তার ছিলনা। 

‘ফেডারেশন’ তখন সবেমাত্র গঠিত হয়েছে। ‘ফেডারেশন’ বুঝতে পারল, সমস্ত সংগঠিত ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মারফতেই কেবল অনুকূল ফল লাভ করার সম্ভাবনা আছে। তাই তাঁরা আরেকটি বড় শ্রমিক সংগঠন ‘নাইটস অব লেবর’ – এর কাছে আবেদন করলেন যাতে করে তাঁরা আট-ঘন্টার দাবি আন্দোলনের পেছনে সমর্থন জানান। 

১৮৮৫ সালে ‘ফেডারেশন’-এর সম্মেলন থেকে পরবর্তী বছরে ১লা মে ধর্মঘট করে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত পুনরায় ঘোষণা করা হয়। মে দিবসের আন্দোলন শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই ফল ফলতে আরম্ভ করে। ইউনিয়গুলোর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ‘নাইটস অব লেবর’-এর সদস্য সংখ্যা ২ লক্ষ থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৭লক্ষ। আট-ঘন্টা কাজের আন্দোলনের সূচনা ও ধর্মঘটের তারিখ ঠিক করেছিল ‘ফেডারেশন’। কাজে কাজেই এই সদস্য সংখ্যা খুব বেড়ে গেল; বিশেষ করে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে বৃদ্ধি পেল এর মর্যাদা। 

ধর্মঘটের দিন যতই ঘনিয়ে এলো, ততই একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠল যে ‘নাইটস অব লেবর’-এর নেতারা আন্দোলনে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তারা এমন কি ‘নাইটস অব লেবর’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলিকে ধর্মঘট না করার গোপন পরামর্শ দিতেও তারা পেছপা হয়নি। এর ফলে ফেডারেশনের মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা আরও অনেক বৃদ্ধি পায়। উভয় সংগঠনের সাধারণ কর্মীরাই উৎসাহের সঙ্গে ধর্মঘটের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। শহরে শহরে আট-ঘন্টা-শ্রম-সমিতি গড়ে উঠল; অসংগঠিত শ্রমিকদের মধ্যেও এর ছোঁয়াচ লাগল; আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণীর ইতিহাসে নতুন ভোরের আরো দেখা দিল। 

ধর্মঘটের ফলে ১৮৮৫ সালে যেখানে জড়িয়ে পড়ে মাত্র ২৪৬৭টি প্রতিষ্ঠান, ১৮৮৬ সালে সেখানে জড়িয়ে পড়ে ১১৫৬২টি। এ থেকে আঁচ করা যায় ১৮৮৬ সালে ধর্মঘট আন্দোলন কী দারুণ ব্যাপকতা লাভ করেছিল। ‘নাইটস অব লেবর’- এর নেতাদের খোলাখুলি সাবোতাজ সত্ত্বেও, হিসেব করে দেখা যায় যে ৫ লক্ষ শ্রমিক আট-ঘন্টা-শ্রম-আন্দোলনের ধর্মঘটগুলোতে সরাসরিভাবে অংশগ্রহণ করেন। 

ধর্মঘটের কেন্দ্র ছিল শিকাগো। ধর্মঘটের আন্দোলন সেখানে সবচাইতে ব্যাপকতা লাভ করে। কিন্তু নিউইয়র্ক, বালটিমোর, ওয়াশিংটন, মিলওয়াকি, সিনসিন্নাটি, সেন্টলুই, পিটারসবার্গ, ডেট্রয় এবং আরও অনেক শহর ধর্মঘট করে বেরিয়ে অসার ব্যাপারে প্রশংসনীয় ভূমিকা গ্রহণ করে। এ ধর্মঘট আন্দোলনে অদক্ষ এবং অসংগঠিত শ্রমিকেরাও সংগ্রামের আবর্তে এসে গিয়েছিলেন। সহানুভূতিসূচক ধর্মঘট এই যুগে প্রায় একটা রেওয়াজেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, সারা দেশ জুড়ে একটি বিদ্রোহী মনোভাবের অভ্যুত্থান ঘটেছিল। বুর্জোয়া ঐতিহাসিকরা, এই যুগের মনোভাবকে ‘সামাজিক যুদ্ধ’, ‘পুঁজির প্রতি ঘৃণা’ প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। দেখা যায়, মে দিবসে যারা ধর্মঘট করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অর্ধেকের মতো আট-ঘন্টা কাজের দাবি আদায় করতে সফল হন; এবং যেখানে তাঁরা পুরোপুরি সফল হননি সেখানেও কাজের ঘন্টা কমাতে তাঁরা যথেষ্ট সাফল্য লাভ করেছিলেন।

শিকাগো ধর্মঘট এবং হে মার্কেটের ঘটনা

সেকালে বামপন্থী সংগ্রামী শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল শিকাগো। স্বভাবত এই শিকাগোতেই ১লা মে’র ধর্মঘট খুব জঙ্গী চেহারা ধারণ করে। সংগ্রামী শ্রমিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতার ফলে শিকাগোর ধর্মঘট বিরাট আকার ধারণ করল। ধর্মঘট শুরু হবার অনেক আগেই ধর্মঘটের প্রস্তুতি চালাবার জন্য সেখানে একটি আট-ঘন্টা-শ্রম-সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই অট-ঘন্টা-শ্রম-সমিতি ছিল একটি ঐক্যবদ্ধ মোর্চার প্রতীক। এই সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল ‘ফেডারেশন’, ‘নাইটস অব লেবর’ এবং আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম সংগঠিত সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ‘সোস্যালিস্ট লেবর পাটি’র অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়গুলো। সমস্ত বামপন্থী শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘সেন্ট্রাল লেবর ইউনিয়ন’।তারা এই আট-ঘন্টা-শ্রম-সমিতিকে সমর্থন জানায়। ১লা মে’র ঠিক আগেকার রবিবারে ‘সেন্ট্রাল লেবর ইউনিয়ন’ একটি সমাবেশ সংগঠিত করে; ২৫০০০ শ্রমিক এই জমায়েত অংশগ্রহণ করেন। 

১লা মে তারিখে শিকাগোতে শ্রমিকদের এক সুবিশাল সমাবেশ হয়; শহরে সংগঠিত শ্রমিক-আন্দোলনের ডাকে এই সমস্ত শ্রমিক কাজ বন্ধ করে বেরিয়ে এসেছিলেন। শ্রমিক-আন্দোলনের ইতিহাসে এর আগে শ্রেণীসংহতির এত বলিষ্ঠ প্রকাশ আর দেখা যায়নি। সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে আট-ঘন্টা কাজের এই আওয়াজ এবং ধর্মঘটের বিস্তৃতি ও চরিত্র সমগ্র আন্দোলনকেই গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যে মন্ডিত করেছিল। ১৮৮৬ সালে ১লা মে’র ধর্মঘটে-আট-ঘন্টা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে; আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামী ইতিহাসে এই আন্দোলন রচনা করে এক গৌরবময় অধ্যায়। 

শ্রমিকশ্রেণীর শত্রুরাও সে সময় নিস্ক্রিয় ছিল না। মালিক এবং শিকাগো সরকারের সম্মিলিত শক্তি সংগ্রামী নেতাদের ধ্বংস করে ফেলতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল; তারা ভেবেছিল এর ফলে শিকাগোর সমগ্র শ্রমিক আন্দোলনকে মারাত্মক আঘাত হানা সম্ভব হবে, বৃহত্তর ক্ষমতার বলে তারা শিকাগোর শ্রমিক অভিযানের গতি রোধ করে। এই ১লা মে তারিখের ঘটনারই প্রত্যক্ষ পরিণতি হলো ৩রা ও ৪ঠা মে তারিখের ঘটনাগুলো- হে মার্কেটের ঘটনা বলে যা পরিচিত। ৩রা মে তারিখের ‘ম্যাক-কর্মিকরিপার কারখানা’র ধর্মঘটী শ্রমিকদের এক সভায় পুলিস জানোয়ারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ছ’জন শ্রমিককে হত্যা এবং অনেককে আহত করে। পুলিসের এই পাশব আক্রমণের প্রতিবাদে ৪ঠা মে হে মার্খেট স্কোয়ারে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল এবং সেদিনকার মতো স্থগিত হতে যাচ্ছিল, এমন সমায় সমবেত শ্রমিকদের উপর পুলিস আবার আক্রমণ করে, ভিড়ের মধ্যে একটি বোমা এসে পড়ে এবং তার আঘাতে একজন সার্জেন্ট নিহত হয়। সঙ্গে সঙ্গেই লড়াই শুরু হয়ে গেল: সে লড়াইয়ে মুত্যু হয় সাতজন পুলিসের আর চার জন শ্রমিকের। 

হে মার্কেটে রক্তের প্লাবন, পার্সনস, স্পাইজ, ফিসার এবং এঙ্গেলের ফাঁসির মঞ্চে নির্বিচারে প্রাণহরণ, শিকাগোর সংগ্রামী শ্রমিক নেতাদের কারাগারে প্রেরণ- এই হলো শ্রমিকদের প্রতি মলিকপক্ষের জবাব। সারা দেশ জুড়ে মালিকদের কাছে এটা হলো শ্রমিকদের উপর আক্রমণ চালানোর সঙ্কেত হিসাবে।১৮৮৫-৮৬ সালের ধর্মঘট আন্দোলনে যে ক্ষমতা তারা হারিয়েছে তা আবার উদ্ধার করার লক্ষ্যে ১৮৮৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে শ্রমিকদের উপর চললো মালিকদের সুসংহত আক্রমণ । 

১লা মে ‘মহান মে দিবস’-এর ঘোষণা

শিকাগোর শ্রমিক নেতাদের ফাঁসির এক বছর পরে ১৮৮৮ সালে বর্তমানে আমেরিকায় ‘ফেডারেশন অব লেবর’ বলে যা পরিচিত সেই ‘ফেডারেশন’ সেন্ট লুই সম্মেলনে আট-ঘন্টা কাজের আন্দোলন আবার শুরু ও সংগঠিত করার প্রস্তাব গ্রহণ করে। পর পর দু’বছর ধরে একটি রাজনৈতিক শ্রেণী দাবির উপর সংগঠিত শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুর ভূমিকা গ্রহণ করে যে তারিখটি স্বকীয় ঐতিহ্য রচনা করেছে, সেই ১লা মে তারিখটিকেই বেছে নেওয়া হলো আট-ঘন্টা কাজের আন্দোলন পুনরুজ্জীবনের দিন হিসাবে। 

শ্রমিক শ্রেণীর প্রথম আন্তর্জাতিক ১৮৭২ সালে অকার্যকর হওয়ার পর, ১৮৮৯ সালে পুনর্গঠিত হয়। পরে যার নাম হয় ‘দ্বিতীয় আন্তÍর্জাতিক’। এর প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পারিতে । এর উদ্বোধনী সভায় দেশ বিদেশের প্রতিনিধিরা আমেরিকার প্রতিনিধিদের কাছে থেকে শুনতে পেলেন ১৮৮৪-৮৬ সালের আট-ঘন্টা আন্দোলনের এবং তার সাম্প্রতিক পুনরুজ্জীবনের কাহিনী। আমেরকিার শ্রমিকদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হযে পারিতে কংগ্রেস নিম্নলিখিত প্রস্তাব গ্রহণ করেঃ 

“যাতে করে একটি নির্দিষ্ট দিবসে সমস্ত দেশের সমস্ত শহরের মেহনতী মানুষ তাদের নিজ নিজ সরকারের কাছে আট-ঘন্টা কাজের সময় আইন করে বেঁধে দেবার দাবি উত্থাপন করতে এবং এই কংগ্রেসে গৃহীত অন্যান্য সিদ্ধান্ত কার্যে পরিণত করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে এই কংগ্রেস একটি বিশাল আন্তর্জাতিক বিক্ষোভ প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। যেহেতু ১৮৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সেন্ট লুই সম্মেলনে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবর’ ১৮৯০ সালের ১লা মে তারিখে অনুরূপ বিক্ষোভ প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত ইতিপূর্বে গ্রহণ করেছে, সেহেতু উক্ত তারিখটিকেই আন্তর্জাতিক বিক্ষোভ প্রদর্শনের দিন হিসাবে নির্দিষ্ট করা হলো। নিজ নিজ দেশের অবস্থা অনুযায়ী বিক্ষোভ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের অবশ্য কর্তব্য।” 

যদিও তখনও সংস্কারবাদী ও সুবিদাবাদী নেতারা এর বিরোধীতা করেন।

মহান মে দিবস দুনিয়া জোড়া শ্রমিক শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের পথ দেখালো 

১৮৯০ সালের ১লা মে কাজের সময় কমাবার দাবিতে সারা দেশ জুড়ে ধর্মঘটের ঢেউ বয়ে গেল। ইউরোপের অনেক দেশেই মে দিবস উদযাপন করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রী পিটার ম্যাকগুই এর নেতৃত্বে ‘কাপেন্টার্স ইউনিয়ন’ এবং অন্যান্য নির্মাণ শিল্পের কর্মীরা অট-ঘন্টা কাজের দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট প্রতিপালন করেন। সমাজতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বিশেষ আইন বলবৎ থাকা সত্ত্বেও জার্মানির বিভিন্ন শিল্প অঞ্চলে মে দিবস উদযাপিত হয়। এইভাবে ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজধানীতেও কর্তৃপক্ষের হুঁশিয়ারি ও দমনমূলক ব্যবস্থাদি উপেক্ষা করে সভা-শোভাযাত্রায় ব্যবস্থা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিকাগো এবং নিউইয়র্কের শোভাযাত্রার বিশেষ তাৎপর্য ছিল। হাজারে হাজারে মেহনতী মানুষ ৮ ঘন্টার দাবিতে পথে পথে মার্চ করেন: এই অভিযান শেষ হয় খোলা ময়দানে, বিরাট কেন্দ্রীয় সমাবেশের মধ্যে। 

একই সময় দেশে দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমাবেশের এই তাৎপর্য ক্রমশই ব্যাপকতরভাবে সারা দুনিয়ার মেহনতী মানুষের কল্পনা ও বৈপ্লবিক চেতনাকে অধিকার করে ফেলেছিল; এবং প্রত্যেক বছরেই আগের বছরের তুলনায় জনসাধারণ বিপুলতর সংখ্যায় সভা-শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।

বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের সাথে ও সংস্কারবাদী বিশ্বাসঘাতকদের লড়াই অনেক পুরনো

১৮৯৩ সালে আন্তর্জাতিকের জুরিখে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে ১লা মে প্রস্তাবের সঙ্গে এঙ্গেলস-এর উপস্থিতিতে যে অংশ যোগ করা হয়, তা থেকেই বোঝা যাবে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কী পরিমাণে সাড়া তখন জেগেছিল:

  “আট-ঘন্টার দাবিতে ১লা মে তারিখে যে শ্রমিক সমাবেশ, তা শ্রমিকশ্রেণীর সুদৃঢ় সঙ্কল্পের অঙ্গীকার; এই সঙ্কল্প হলো সামাজিক পরিবর্তনের মারফত শ্রেণী-বৈষম্যের বিলোপ সাধন করা; এবং এইভাবে শ্রেণী-বৈষম্যের বিলোপের ম্যাধমে সমস্ত জাতির শান্তির পথে আন্তর্জাতিক শান্তির একমাত্র সড়কে পদার্পণ করা।” 

বিভিন্ন দলের সংস্কারবাদী নেতাদের চেষ্টা হলো সংগ্রামের দিনের পরিবর্তে বিশ্রাম ও আমোদ-প্রমোদের দিনে পরিণত করে মে দিবসের সমাবেশকে প্রাণহীন করে দেওয়া। এই জন্য তারা চেষ্টা করত, মে দিবসের পরবর্তী প্রথম রবিবার অবধি সভা-সমাবেশ ঝুলিয়ে রাখতে। রবিবার শ্রমিকদের ধর্মঘট করবার প্রয়োজন হবে না, কারণ রবিার কাজ করতে হয় না। সংস্কারবাদী নেতাদের চোখে মে দিবস হলো নিছক একটা আন্তর্জাতিক ছুটির দিন: পার্কে পার্কে বা শহরতলীর কোনো পল্লীতে আমোদ-প্রমোদ আর খেলা-ধুলার দিন। জুরিখ কংগ্রেসের প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছিল যে, মে দিবস হবে “শ্রেণী-বৈষম্য বিলোপের জন্য শ্রমিকশ্রেণীর সুদৃঢ় সঙ্কল্পের অঙ্গীকার” অর্থাৎ শোষণ এবং মজুরি-দাসত্বের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদের জন্য সুদৃঢ় সঙ্কল্পের অঙ্গীকার। সুবিধাবাদী  নেতারা শ্রমিকশ্রেণীর সম্মিলিত আন্তর্জাতিক আন্দোলনকে নিরুৎসাহিত ও ব্যাহত করতে সবরকমের অপচেষ্টা করতেন। ২০ বছর পরে এইসব সংস্কারবাদী নেতাদের ‘সমাজতন্ত্র’ এবং ‘আন্তর্জাতিকতার’ মুখোশ একেবারেই খুলে পড়ল। ১৯১৪ সালে ‘আন্তর্জাতিক’ বিপর্যস্ত হয়ে গেল, কেননা জন্ম থেকে এর অভ্যন্তরেই এর ধ্বংসের বীজ নিহিত ছিল- এই ধ্বংসের বীজ হলো শ্রমিকশ্রেণীর সংস্কারবাদী ধুরন্ধররা। 

ক্রমে ক্রমে মে দিবসের বিক্ষোভগুলো শ্রমিকশ্রেণীর শক্তিমত্তার অঙ্গীকার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে লাগল; মে দিবসের অনুষ্ঠানে যোগদানকারী এবং ধর্মঘটী সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল: ১লা মে লাল দিনে পরিণত হলো; বছরের পর বছর ১লা মে ঘুরে আসবার সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী শঙ্কিত হয়ে উঠতে লাগল। 

মে দিবস সম্পর্কে লেনিন

রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনে তার কর্মজীবনের গোড়ার দিকেই রাশিয়ার শ্রমিকদের কাছে মে দিবসকে বিক্ষোভ ও সংগ্রামের দিবস হিসাবে তুলে ধরেন লেনিন। ১৮৯৬ সাল থেকে জেলে আটক থাকাকালে তিনি একটি মে দিবসের ইশতেহার রচনা করেন। “এক মাস পরে যখন ১৮৯৬ সালের বিখ্যাত সুতাকলের ধর্মঘট ফেটে পড়ল, তখন শ্রমিকরা আমাদের বলেছিলেন যে ছোটো সাধাসিধে ইশতেহারখানাই প্রথম তাঁদের প্রেরণা যুগিয়েছিল।” 

কলকারখানায় কীভাবে মালিকের স্বার্থে মজুরদের শোষণ করা হয় এবং কীভাবে অবস্থা উন্নয়নের দাবি তুললে সরকার তাদের নির্যাতন করে তা বলবার পরে, উক্ত ইশতেহারে লেনিন মে দিবসের তাৎপর্য বর্ণনা করেছেনঃ 

ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি এবং অন্যান্য দেশ যেখানে শ্রমিকরা ইতিপূর্বেই শক্তিশালী সব ইউনিয়নে সংগঠিত হয়েছেন এবং নিজেদের জন্য অনেক অধিকার আদায় করেছেন- সেই সমস্ত দেশ ১লা মে তারিখটিকে শ্রমিকশ্রেণীর সর্বজনীন কর্মবিরতির দিন হিসাবে ঠিক করেছে। কলকারখানার গুমোট পেছনে ফেলে নিশান উড়িয়ে সঙ্গীতের তালে তালে তাঁরা মার্চ করেন শহরের বড় বড় সড়কে; মালিকরা দেখতে পায়, তাঁদের ক্রমবর্ধমান শক্তি। শ্রমিকরা জমায়েত হন বিরাট গণসমাবেশে মালিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিগত বছরের জয়ের সালতামামি দিয়ে সেখানে বক্তৃতা হয়; সেইসব সমাবেশে শ্রমিকরা ভবিষ্যতের সংগ্রামের পরিকল্পনাও হাজির করেন। সেইদিন থেকে কাজ না করার জন্য মালিকরা শ্রমিকদের জরিমানা করতে সাহস পায় না। কারণ ধর্মঘটের ভয় আছে। এই দিনেই আবার শ্রমিকরা মালিকদের স্মরণ করিয়ে দেন তাঁদের প্রধান দাবি: ৮ ঘন্টা কাজ, ৮ ঘন্টা আমোদ-প্রমোদ, ৮ ঘন্টা বিশ্রাম, এই আওয়াজই আজ অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের দাবি।” 

মে দিবসের ছ’মাস আগে লেনিন মে দিবসের অনুষ্ঠানাদির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর কাছে মে দিবস ছিল, “রাশিয়ার মানুষের রাজনৈতিক মুক্তির জন্য অপরাজেয় সংগ্রাম” এবং “শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীগত অগ্রগতি ও সমাজতন্ত্রের জন্য সরাসরি সংগ্রাম” এর কেন্দ্রবিন্দু। 

নতুনতর পর্যায়ে সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার হাতিয়ারে পরিণত হল মহান মে দিবস। 

আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণীর কাজে মে দিবসগুলো হয়ে উঠল এক একটা কেন্দ্রবিন্দু। আট-ঘন্টা কাজের দিনের মূল দাবির সঙ্গে আরও সব তাৎপর্যপূর্ণ দাবি যুক্ত হলো। এই সমস্ত দাবির ভিত্তিতে মে দিবসের ধর্মঘট ও সভা-শোভাযাত্রায় সংহত হয়ে দাঁড়াবার জন্য শ্রমিকদের আহ্বান জানানো হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণীর একতা- সর্বজনীন ভোটের অধিকার; সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও ঔপনিবেশিক অত্যাচারের বিরোধিতা, মিছিলের অধিকার, রাজবন্দীদের মুক্তি, শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগঠন গড়বার অধিকার প্রভৃতি দাবি এই সমস্ত দাবির অন্তর্ভুক্ত। 

১৯১২ সালের এপ্রিল মাসে সাইবেরিয়ার লেনা সোনার খনিতে ধর্মঘটীদের হত্যাকান্ডের ফলে বিপ্লবী গণ-সংগ্রাম রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণীর আশু কর্মসূচীতে পরিণত হলো আর তখন এই মে দিবসেই হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ রুশ শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন।

মে দিবসের প্রশ্নের উপর পুরনো ‘আন্তর্জাতিক’ শেষবারের মতো আলোচনা করে ১৯০৪ সালে আমস্টার্ডাম কংগ্রেস। মে দিবসের সভা-শোভাযাত্রায় যে সমস্ত স্লোগান তোলা হয়েছিল সেগুলো পর্যালোচনা এবং কোনো কোনো দেশে যে তখনও পর্যন্ত ১লা মে’র পরিবর্তে রবিবার মে দিবস উদযাপন করা হয়, সে সম্বন্ধে উল্লেখের পর, উক্ত প্রস্তাব এইভাবে শেষ করা হয়:

  “আট-ঘন্টা কাজের দিন আইন হিসাবে কায়েম করার দাবিতে, শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীগত দাবিদাওয়া আদায়ের দাবিতে এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১লা মে তারিখে জোরালোভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য আর্মস্টার্ডামে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক কংগ্রেস সমস্ত দেশের সমস্ত পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়নের কাছে আহ্বান জানাচ্ছে। বিক্ষোভ প্রদর্শনের সব চাইতে জোরদার কায়দা হলো কাজ বন্ধ করে দেওয়া। শ্রমিকদের স্বার্থ ব্যাহত না করে যেখানে সম্ভব সেখানেই ১লা মে তারিখে কাজ বন্ধ রাখবার জন্য এই কংগ্রেস সমস্ত দেশের শ্রমিকশ্রেণীর উপর নির্দেশ জারি করেছে।”

১৯১২ সালের এপ্রিল মাসে সাইবেরিয়ার লেনা সোনার খনিতে ধর্মঘটীদের হত্যাকান্ডের ফলে বিপ্লবী গণ-সংগ্রাম রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণীর আশু কর্মসূচীতে পরিণত হলো আর তখন এই মে দিবসেই হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ রুশ শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। তাঁরা বেরিয়ে এলেন প্রতিক্রিয়াশীল জারতন্ত্র্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসাবে; যে জারতন্ত্র ১৯০৫ সালে প্রথম রুশ বিপ্লবের পরাজয়ের পর থেকে দোর্দন্ডপ্রত্যাপে বিরাজ করছিল। এই মে দিবস সম্পর্কে লেনিন লিখেছেনঃ

  “সারা রাশিয়ার জুড়ে মে দিবসের মহান ধর্মঘট, উক্ত ধর্মঘটের সঙ্গে জড়িত মিছিল সমূহ, বিপ্লবী ঘোষণাবলী, মেহনতী মানুষের জমায়েত, বিভিন্ন বিপ্লবী বক্তৃতা- এইসব থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে রাশিয়া পুনরায় এক ঘনায়মান বিপ্লবী পরিস্থিতিতে প্রবেশ করেছে।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে মে দিবস

১৯১৪-১৭ সালে প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের সময় মে দিবস হয়ে ওঠে এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯১৭ সালের রাশিয়ার বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণী সম্রাট ও বুর্জোয়াদের উৎখাত করে রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখল করে। ১৮৯০ সালে ১লা মে নিউইয়র্কের ইউনিয়ন স্কোয়ারে প্রথম মে দিবসের সমাবেশে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবর’ যে আকাংক্ষা প্রকাশ করে সেই আকাংক্ষাই বাস্তবে রূপায়িত হলো জগতের ছ’ভাগের একভাগ শ্রমিকশ্রেণীর বিজয়লাভের ঘটনায়। “আট-ঘন্টা কাজের দিনের দাবি পূরণের সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাব- কিন্তু কখনও ভুলব না, আমাদের শেষ লক্ষ্য হলো (পুঁজিবাদী) মজুরি-ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন”- উক্ত দিবস ধর্মঘটী শ্রমিকদের কাছে উত্থাপিত প্রস্তাবে লেখা ছিল এই বাণী। এই লক্ষ্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম রাশিয়ার শ্রমিকরাই সর্বপ্রথম বিজয় লাভ করেন।

রুশ বিপ্লবের বিজয় বিশ্বব্যাপী শ্রমিক শ্রেণীকে মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। এর পর প্রতিটি মে দিবস রুশ বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের চেতনায় আন্দোলিত হতে থাকে। আমেরিকার বুর্জোয়া শাসকরা ও তাদের দালাল ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা সেপ্টেম্বরের ১ম সোমবার কে শ্রমিক দিবস পালন এবং ১ লা মে-তে শিশু দিবস পালনের ষড়যন্ত্র করে।

মহামন্দার কালে মে দিবস

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর শ্রমিক শ্রেণীর সামনে যে বিপদ ঘনিয়ে আসছে সে বিষয়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের সচেতন ও সংগঠিত করার বদলে প্রতিক্রিয়াশীল ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা পুজিঁবাদে স্থায়ী সমৃদ্ধির মোহ সৃষ্টি করতে থাকে। কিন্তু ১৯২৯ সালের শেষাশেষি অর্থনৈতিক বিপর্যয় যখন ফেটে পড়ল, এবং ট্রাস্ট আর একচেটিয়া পুঁজিবাদীরা চেষ্টা করতে লাগল সঙ্কটের সমস্ত বোঝাটাই মেহনতী মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দিতে। ফলে শ্রমিকদের বেকারত্ব, অনাহার চরমাকার ধারণ করে। তখন ধর্মঘট এবং বেকারদের গণ সংগ্রাম ছাড়া শ্রমিকশ্রেণীর আর কোনো অবলম্বন ছিল না। এই সমস্ত গণ-সংগ্রামে কমিউনিস্টরা প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। 

মাত্র পনেরো বছরের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, বিপ্লব এবং অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটে বিপর্যস্ত বিশ্ব পুঁজিতন্ত্র স্পষ্টতই সাধারণ সঙ্কটের যুগে প্রবেশ করল। সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে উঠল আরও তীব্র। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কব্জা বজায় রাখবার এবং ফ্যাসিবাদী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ইতিহাসের অনিবার্য অগ্রগতি রোধ করবার ব্যাপারে ট্রাস্টের একচেটিয়া পুঁজিপতিরা তৎপর হয়ে উঠল। পরাজিত জার্মানি এবং অন্যান্য যেসব দেশে শ্রমিকশ্রেণী ও অপরাপর প্রগতিশীল শক্তিগুলোর অনৈক্য ও দুর্বলতা ফ্যাসিবাদীদের বিজয়ের সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিল, সেখানে ফ্যাসিবাদীদের সংগঠন ও অর্থসংস্থাপন করতে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার একচেটিয়া পুঁজিপতিরা সর্বশক্তি নিয়োগ করছিল। 

ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম

১৯৩০ সাল থেকে সমগ্র দশক জুড়েই মে দিবস ধ্বনিত করল ফ্যাসিস্ট আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান, ধ্বনিত করল সম্ভাব্য বিশ্বব্যাপী হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তি ও মানুষের কাছে প্রতিরোধের আহ্বান। 

শ্রমিকশ্রেণীই যে বাস্তবিকপক্ষে জাতির মেরুদন্ড, এই সত্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সন্দেহতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল। ফ্যাসিবাদ যে ক্ষমতা দখল করতে এবং জগতকে সর্বনাশা যুদ্ধে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হলো, তার কারণ শ্রমিকশ্রেণী ছিল তখন বিভক্ত। এই জীবনমরণ যুদ্ধে সারা দুনিয়ার গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ স্বপক্ষে দেখতে পেল যে, জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও প্রগতির এই ঐতিহাসিক সংগ্রামের পুরোভাগে এসে দাঁড়য়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, দাঁড়িয়েছে মেহনতী জনতা। 

যুদ্ধের মধ্যে শ্রমিকশ্রেণী মে দিবস উদযাপন করেন সর্বত্র কাজ চালু রেখে এবং ফ্যাসিস্ট দুস্যুবাহিনীকে ধ্বংস করবার জন্য অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করে। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হবার পর মে দিবস সমবেত করল কোটি কোটি মেহনতী মানুষকে। বিশেষ করে ইউরোপের বিজয়ী ও মুক্ত দেশগুলোতে। কোটি কোটি মানুষের এই সমাবেশে মূর্ত হয়ে উঠল ফ্যাসিজম-এর শেষ চিহ্ন লুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাবার- সঙ্কল্প। চিরদিনের জন্য শ্রমিকশ্রেণীর সঙ্গে অন্যান্য প্রগতিশীল অংশের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবার, গণতন্ত্র তথা জনতার সার্বভৌম ক্ষমতা বজায় রাখবার ও বিস্তার করবার- সঙ্কল্প, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবার এবং শোষণ পীড়ণমুক্ত সমাজতন্ত্রী দুনিয়ার দিকে পথ প্রস্তুত করবার-সঙ্কল্প। 

শেষ কথা

আজও দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণীর সাচ্চা ট্রেডইউনিয়ন প্রতিনিধিরা, কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা সেই সংগ্রামী ধারাতেই মহান মে দিবস উদযাপন করেন। মে দিবসের ইতিহাস দেখিয়ে দিচ্ছে যে, শ্রমিক শ্রেণীর আশু দাবী-দাওয়া থেকে শুরু করে তার রাজনৈতিক মুক্তির রক্তাক্ত সংগ্রাম দানা বেঁধে ওঠার মধ্যদিয়েই পহেলা মে মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আকারে সৃষ্টি হয়েছে। আবার মে দিবস সৃষ্টির পর, তা শ্রমিক শ্রেণীর সেই সংগ্রামকে দুনিয়া ব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বাঁক সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীল মালিক শ্রেণী ও তাদের দালাল শ্রমিক নেতারা মে দিবসের সংগ্রামী চেতনাকে ধ্বংস করার জন্য বহুগুণে সক্রিয়। তারা একে রঙ্গ-তামাসার দিনে পরিণত করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে. মালিকের কাজ মালিক করেছে। কিন্তু আমরা শ্রমিকরা কি করব? আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব না মালিকের বাদ্য বাজাবো? এর উত্তরের উপর নির্ভর করছে, আমাদের ভবিষ্যৎ। 

(নোট: ইতিহাসের অংশটি মূলত ট্রাকটেনবার্গের রচনার অনুবাদ ‌’মে দিবসের  ইতিহাস’; যা ইস্টিশন ব্লগে সাম্যবাদী পুনঃপ্রকাশ করেছেন; তা অবলম্বনে  লিখিত)

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন