২৬ আগস্ট জীবন ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ে এক অহংকারী দিন। নিপীড়িত জনগণের গণসংগ্রাম ও গণক্ষমতার উজ্জ্বলতায় রাঙ্গা এই দিন; সারা দেশের মানুষের সংগ্রামী প্রেরণার এক জীবন্ত উৎস। এ সংগ্রাম সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রতিরোধের অনন্য ইতিহাস। এই ইতিহাসের স্রষ্টা ফুলবাড়ির জনগণ; এদেশের জনগণ। আমরা এই মহান সংগ্রামে শহীদ আমিন, সালেকিন ও তরিকুল এবং ফুলবাড়ির বীর জনতাকে জানাই লাল সালাম!
সে সময় ফুলবাড়ির কয়লা লুটের জন্য সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানি এশিয়া এনার্জি মরিয়া হয়ে উঠেছিল। আর একাজে সবরকম মদদ দিতে থাকে সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার শাসক শ্রেণী ও তাদের স্থানীয় দোসররা। তাদের সেই বেপরোয়া প্রচেষ্টা জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। জনগণের গণসংগ্রামের জোয়ার যখন এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ির মাটি থেকে উৎখাতের উপক্রম করে, তখন তৎকালীন ফ্যাসিস্ট বিএনপি-জামাত জোট সরকার বন্দুকের জোরে তাদের রক্ষার চেষ্টা চালায়। ফুলবাড়ির গণসংগ্রামকে রক্তে ডুবিয়ে দিতে চায়। কিন্তু, শহীদের রক্তে সংগ্রামের আগুন নিভেনি। বরং তা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। জনগণের অভ্যুত্থানের মুখে শত্রু পিছু হটতে বাধ্য হয়। জনগণ এশিয়া এনার্জির স্থানীয় দালালদের তাড়িয়ে দিয়ে সমগ্র অঞ্চলে জনগণের প্রভাব বিস্তার করে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাথে ৬ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করতে সরকার বাধ্য হয়।
এই মহান আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের পরও কয়লা লুটের তৎপরতা পুরোপুরি থেমে যায়নি। এশিয়া এনার্জির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করার বিষয়ে চুক্তি হলেও সাম্রাজ্যবাদের দালাল কোন সরকারই আজ পর্যন্ত তা কার্যকর করেনি। বর্তমানে এশিয়া এনার্জি “গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট বা জিসিএম” নামে তাদের তৎপরতা জারি রেখেছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা আজও তুলে নেয়া হয়নি।
কেবল ফুলবাড়িতেই নয়, বিদেশী শক্তি ও তার দালাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এদেশের জনগণ বারবার বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। অথচ শহীদের রক্ত, স্বপ্ন, গৌরব আজ ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
আজ দেশ ভারত, মার্কিন, চীনসহ বিবিধ বিদেশী শক্তি এবং তার দালাল অতিধনী শ্রেণী শোষণ-লুণ্ঠন-পাচারের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এ স্বর্গরাজ্যের প্রহরী হল আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। অপরদিকে, শোষণ-লুণ্ঠন-পাচার ও ফ্যাবিাদী দমন-পীড়নে জনগণের জন্যে এদেশ পরিণত হয়েছে হাবিয়া দোজখে।
এই ফ্যাসিস্ট সরকার ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেশ বিকিয়ে ফের ক্ষমতায় আসার জন্য আমাদের সব কিছু উজার করে দিচ্ছে। তাই এই ফ্যাসিস্ট মীরজাফর সরকারের ধ্বংস কামনা করছেন। কিন্তু ফুলবাড়ি চুক্তি পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করছে, আওয়ামী ও বিএনপি শরীকদের মধ্যে সরকার বদলে চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি, জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ উভয় রাজনৈতিক দলই বস্তুত বিদেশী শক্তির দালাল লুণ্ঠনমত্ত অতিধনীদের স্বার্থরক্ষাকারী দল।
তাই আজকে এই হাবিয়া দোজখ থেকে মুক্তির উপায় হল এই ফ্যাসিস্ট দস্যুদের রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা; জনগণের নিজের হাতে ক্ষমতা নেয়া। আর এটা সম্ভব কেবল ফ্যাসিস্ট জনগণের নিজস্ব শক্তি ও দল গড়ে তুলেই । আজ যখন দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী নিপীড়নে শ্রমিক, কৃষক, জনগণের সংঘ ও সংগ্রাম দুর্বল হয়ে পড়েছে, তখন ফুলবাড়ির গণসংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান, গণশক্তির উন্মেষ যে দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে- তা আজ ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে আমাদের পথ দেখাতে পারে।
আসুন, ফ্যাসিস্ট সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে শেষযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে ফুলবাড়ি, কানসাটের শিক্ষা প্রয়োগ করি। গ্রাম ও শিল্পাঞ্চলে, শিক্ষাঙ্গণে ফ্যাসিবাদী স্থানীয় দুর্গগুলো দখলের সংগ্রাম বেগবান করে জনগণের রাজনৈতিক দল ও মোর্চার বিকাশসহ গণশক্তির উত্থান ঘটায়।

