ধর্ষণের জন্য ধর্ষণের মানসিকতার প্রয়োজন হয়। এই মানসিকতার উৎস কি তা বিশ্লেষণ করা দরকার। নারীকে যৌনভোগ্য বস্তু হিসাবে এবং নিজেকে তা ভোগের অধিপতি হিসাবে গণ্য করার মানস ধর্ষকামী মানসিকতার প্রথম শর্ত। বিজ্ঞাপন, পর্নো, পোশাক, প্রসাধন কিংবা শো-বিজে যেমন নারীকে যৌনভোগ্য বস্তু আর পুরুষকে ”আলফা মেইল” হিসাবে হাজির করা হয়, তেমনি ভারতীয় সিরিয়ালে ঘরের লক্ষ্মী কিংবা ধর্মীয় শিক্ষায় যৌন অবদমনসহ তেতুল তত্ত্বের আরেক বিকৃত ব্যবহার দেখা যায়। এই হেজিমনিক সংস্কৃতিই ধর্ষকামী মানস গঠনে সহায়তা করে। এটা মূলত পিতৃতন্ত্রিক সংস্কৃতি ও মানস।
ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং পরিবারের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজেই পিতৃতন্ত্র এবং পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছে। ফলে পিতৃতন্ত্রে ধারক-বাহক হিসাবে পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ এই পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি তথা ধর্ষকামী মানস গঠনে ভূমিকা রাখে। আর আমাদের মত সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের অধীন দালাল পুঁজিবাদ ও আধা-সামন্তবাদী সমাজে এই ধর্ষকামী মানসিকতা অতি প্রকট রূপ নেবে- এটাই বাস্তবতা। এ কারণে আমাদের মত সমাজে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে যৌন নিপীড়নে নারীকে দোষ দেয়া, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা, ধর্ষকের সাথে বিয়েসহ অপরাধকে হাল্কাভাবে নেয়া কিংবা স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা দেখা যায়। আইন ও বিচার ব্যবস্থায় মানসিকতার প্রতিফলন ঘটে প্রতিনিয়ত। সৃষ্টি হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এটা হলো দ্বিতীয় শর্ত যা ধর্ষক তৈরী করে। আর এই পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার সাথে যখন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় ক্ষমতা যুক্ত হয়, তখন তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
যৌননিপীড়ন, ধর্ষণ, বলাৎকারের যে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে তার উৎস মূলত এই সাম্রাজ্যবাদী, সম্প্রসারণবাদী, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ও সামন্তীয় ব্যবস্থা। তাই ধর্ষকের বিচার, আইন-বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ নারীর শারিরীক নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় মৌলিক পরিবর্তন দূরের কথা সামান্যতম পরিবর্তন আনবে কিনা সন্দেহ। তবে এই বিক্ষোভকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারক-বাহক শাসন ব্যবস্থার নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবী রূপান্তরের পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য ধর্ষণবিরোধী জনসাধারণকে ক্রমাগত সচেতন ও সক্রিয় করে তোলাটাই হবে আমাদের বিপ্লবী কর্তব্য।
কিন্তু একই সাথে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন যে, বিদ্যমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনপ্রিয় দাবিকে শাসক শ্রেণীর নানা দল-উপদল নিজ স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা বাড়িয়েছে। ধর্মবাদী গোষ্ঠী তাদের নবলব্ধ ক্ষমতার চর্চা নারীদের ওপর প্রয়োগ করছে। তার বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার থাকতে হবে, তেমনি আবার ‘মুক্তি যুদ্ধের চেতনা” নামক বয়ান ধসে পড়ার পর, নারী নিপীড়নের বিরোধীতাকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ এবং তাদের দালাল পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদ যেন তাদের তথাকথিত ”প্রগতিশীল” বনাম মৌলবাদের রাজনীতি খাড়া করে রাজনৈতিক পরিসর গোছাতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না মার্কিন-ভারতের দালাল আওয়ামী ফ্যাসিবাদও ছিল পিতৃতন্ত্র ও ধর্ষকদের অন্যতম পাহাড়াদার। তারা ধর্ষণের ইস্যুকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনে ব্যবহার করবে মাত্র, যেভাবে তারা শাহবাগকে ব্যবহার করেছিল ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায়। এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী “প্রগতি বনাম মৌলবাদের” ফ্যাসিস্ট রাজনীতি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকেই শক্তিশালী করবে আবার ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাজনীতি আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিকাশে সহায়ক হবে। সুতরাং, এই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে একাধারে আওয়ামী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের শাপলা-শাহবাগ রাজনৈতিক খেলার বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে ধর্ষণবিরোধী জনগণের গণতান্ত্রিক ঐক্যের ভিত্তিতে। এ ঐক্যকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী সত্যিকার প্রগতিশীল থেকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী আলেম-ওলোমাগণ পর্যন্ত বিস্তৃত করতে পারতে হবে।
ছোট্ট আসিয়ার ধর্ষক-হত্যাকারী ব্যবস্থার উৎখাতের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হোন! নয়তো আসিয়াদের ধর্ষণ ও হত্যা বন্ধ করা যাবে না।

