অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার পাশাপাশি একটি ভিতের ওপর টিকে রয়েছে। জুলাই-আগস্টে বাহিনীগুলো যে ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, তা নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতি সম্ভব ছিল না

“অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার পাশাপাশি একটি ভিতের ওপর টিকে রয়েছে। জুলাই-আগস্টে বাহিনীগুলো যে ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, তা নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতি সম্ভব ছিল না। ফলে সরবরাহ করা তথ্য বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। সরকার মনে করছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ধরনের তথ্য গেলে যেমন দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে, তেমনই বাহিনীগুলো বিশ্বে নানা সমালোচনা ও হয়রানির মুখে পড়বে। অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন করে দেশকে গড়ে তোলার কাজ ব্যাহত হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনীর নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে একাধিকবার জাতিসংঘ দল অনুরোধ জানালেও সাড়া মেলেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।”

সরকার বদল মানে রাষ্ট্র বদল নয়। রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণী নিপীড়নের যন্ত্র। রাষ্ট্র গড়ে ওঠে নির্দিষ্ট শ্রেণীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে রক্ষার জন্য। সহজ কথায়, শোষক-শাসক শ্রেণীর জান-মাল-শোষণের ব্যবস্থাকে শোষিত-নিপীড়িত শ্রেণীর প্রত্যাঘাত থেকে দমন-নপীড়ন-বলপ্রয়োগে রক্ষা করা হলো রাষ্ট্রের কাজ। তাই রাষ্ট্রের প্রধান উপাদান হলো বলপ্রয়োগকারী বাহিনী।

সরকার হলো রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থাপনা পরিষদ বিশেষ। বুর্জোয়া গণতন্ত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে শাসক শ্রেণীর কোন অংশ রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে অর্থাৎ শ্রমিক-কৃষক- জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালাবে তা নির্বাচনের মাধ্যমে বাছাই করা হয়। ব্যবস্থাপক বদল যেমন ব্যবস্থার বদল নয়, তেমনি সরকার বদল মানে রাষ্ট্র বদল নয়।

রাষ্ট্র বহাল রেখে শাসকশ্রেণীর এক অংশ থেকে আরেক অংশের হাতে হাত বদল ভোটে হামেশাই ঘটে। অভ্যুত্থান বা গ্রহযুদ্ধের মধ্যদিয়েও ঘটতে পারে। এসবের মধ্যদিয়ে পুরনো রাষ্ট্রের পুনর্গঠন-পুনর্বিন্যাস বা সংস্কারও হতে পারে। কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট শ্রেণী মালিকানা এবং ঐ শ্রেণী তোষণের চরিত্র বদল হয় না। রাষ্ট্রের শ্রেণী মালিকানার পরিবর্তন করতে হলে জনগণকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে নিতে হয় এবং অনিবার্যভাবে পুরনো শ্রেণীর সেবায় নিয়োজিত গণবিরোধী রাষ্ট্রযন্ত্রটিকেও ”চূর্ণবিচূর্ণ” করতে হয়। অন্যথায়র জনগণ জনগণের সেবায় নিয়োজিত নতুন রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তুলতে পারেনা। পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্র চূর্ণ-বিচূর্ণ করে নতুন রাষ্ট্র গঠন, এজন্য জনগণের দ্বারা সংবিধান রচনা হলো রাষ্ট্রবিপ্লব। পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্র বহাল রেখে নতুন সংবিধান প্রণয়নও রাষ্ট্র সংস্কার ছাড়া কিছু নয়। প্রতারকরাই একে বিপ্লব বলে চালিয়ে দিতে চায়।

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের উৎখাতের মধ্যদিয়ে কেবল সরকারই বদল হয়েছে। শাসক শ্রেণীর পুরনো সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্ত-আমলা-দালাল-সামন্ত চরিত্রের পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্র বহলা আছে। রাষ্ট্রের প্রধান উপাদান ফ্যাসিস্ট শাসকদের রক্ষাকারী বলপ্রয়োগকারী বাহিনীর সমর্থনেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গদীতে বসেছে। শাসক শ্রেণীর নতুন অংশ, বৃর্জোয়া তৃতীয় শক্তি ও লিবারেল ইসলমাবাদীরা এই পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সুতরাং বিগত সরকারের গুষ্ঠি উদ্ধার করলেও তাদের পক্ষে এই পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রের কেশাগ্র স্পর্শ করা সম্ভব নয়। বরং পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরো শাসক শ্রেণীর পক্ষে আরো বেশি কার্যকর করে তোলাই তাদের রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচির মূল বিষয়বস্তু। ২৪-এর ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে নিজেদের ক্ষমতার বৈধতার সার্টিফিকেট হিসাবে উচ্চকণ্ঠ এবং শহীদের জন্য মায়াকান্নার প্রদর্শনী সত্ত্বেও- এই সরকার গণহত্যার সাথে যুক্ত বলপ্রয়োগকারী বাহিনীকে রক্ষার এই টালবাহানা করবে- এটাই স্বাভাবিক। জাতিসংঘকে তদন্তে অসহযোগীতা তারই প্রকাশ।

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন