২৬ আগস্ট ফুলবাড়ি দিবসের ৬ষ্ঠ বার্ষিকীতে জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের লিফলেট

ফুলবাড়ীর পথ ধরে এগিয়ে চলুন!

জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও তার দালাল শাসকশ্রেণীর ফ্যাসিবাদী শাসন উৎখাতের মাধ্যমে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের স্বাধীন-সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের দিকে এগিয়ে নিন!

(পিডিএফ ভার্সন পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন)

২৬ আগস্ট জীবন ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ের অহংকারী দিন। নিপীড়িত জনগণের গণসংগ্রাম ও গণক্ষমতার উজ্জ্বলতায় রাঙ্গা এই দিন; সারা দেশের মানুষের সংগ্রামী প্রেরণার এক জীবন্ত উৎস। এ সংগ্রাম সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রতিরোধের অনন্য ইতিহাস। এই ইতিহাসের স্রষ্টা ফুলবাড়ির জনগণ; এদেশের জনগণ। আমরা এই মহান সংগ্রামে শহীদ আমিন, সালেকিন ও তরিকুল এবং ফুলবাড়ির বীর জনতাকে জানাই লাল সালাম!
    সে সময় ফুলবাড়ির কয়লা লুটের জন্য সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানি এশিয়া এনার্জি  মরিয়া হয়ে উঠেছিল। আর একাজে সবরকম মদদ দিতে থাকে সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার এদেশের শাসকশ্রেণী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা। তাদের  সেই বেপরোয়া প্রচেষ্টা জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তৎকালীন ফ্যাসিস্ট বিএনপি-জামাত জোট সরকার বন্দুকের জোরে লুটেরাদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা চালায়। ফুলবাড়ির মাটিকে রক্তে ডুবিয়ে দিতে চায়। কিন্তু, শহীদের রক্তে সংগ্রামের আগুন নিভেনি। বরং তা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে শত্র“কে পিছু হটে যেতে হয়। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাথে ৬ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করতে সরকার বাধ্য হয়।
জনগণের এই মহান আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের পরও কয়লা লুটের তৎপরতা পুরোপুরি থেমে যায়নি। এশিয়া এনার্জির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করার বিষয়ে চুক্তি হলেও তা বাস্তবায়ন আজও হয়নি। বর্তমানে এশিয়া এনার্জি  “গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট বা জিসিএম” নামে তাদের তৎপরতা জারি রেখেছে। উন্মুক্ত কয়লা খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছিল; কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের আঁতাতের ফসল মহাজোট সরকার সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা আজও চালিয়ে যাচ্ছে।

শোষিত-নিপীড়িত জনতা,
বিগত জোট সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি-দুঃশাসন, সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দরুণ দেশী-বিদেশী শাসকদের বৃহদাংশ গণধিকৃত চারদলীয় জোট সরকারের উপর হতে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে। তাদের সমর্থনে, বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশে সেনা-আমলারা তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সামনে রেখে ক্ষমতা দখল করে। ফখরুদ্দীন সরকার দুর্নীতি দমন ও নির্বাচনের আওয়াজ তুললেও, তারা মূলত সমগ্র অর্থনীতি, রাষ্ট্র ও রাজনীতি এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনা বা নীলনকশা মাফিক পুনর্বিন্যাসে তৎপর ছিল। এ পুনর্বিন্যসের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রকে আরো দমনমূলক করে তোলা যাতে খনিজ সম্পদসহ অন্যান্য খাতে দেশী-বিদেশী স্বার্থ হাসিলের বিরুদ্ধে সকল গণপ্রতিরোধ ধ্বংস করা যায়।
সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী নীলনকশা বাস্তবায়নের পথ মসৃন করার প্রয়োজনেই বৈদেশিক ও দেশীয় শাসকশ্রেণী নির্বাচিত তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে নির্বাচনে জয়লাভের পূর্বশর্ত হিসাবে আওয়ামীলীগের সাথে দেশ, জাতি ও জনগণ বিরোধী এক সমঝোতা সৃষ্টি হয়। তার অংশ হিসাবে আওয়ামীলীগ নির্বাচনী ইশতেহারে এবং শহীদের রক্তে রক্তভেজা ফুলবাড়ির মাটিতে দাঁড়িয়ে উন্নয়নের নামে কয়লা খনি বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার ঘোষণা দেয়। এই নীলনকশার অংশ হিসেবে সরকার দেশবিরোধী কয়লা নীতি প্রণয়ন, ভূমি আইন ইত্যাদি সংশোধন করার পদক্ষেপ নিয়েছে।

সচেতন জনতা,
শুধু ফুলবাড়ির কয়লা নয়, এই সরকার ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকারের জাতীয় ও গণবিরোধী কর্মকান্ডকে বৈধতা দান করেছে। এ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আরো বেশি ফ্যাসিস্ট এবং দেশি-বিদেশী নিপীড়ন ও লুণ্ঠনের প্রশ্নহীন দায়মুক্তি নিশ্চিত করেছে। এ সরকার হাসিনা-মনমোহন চুক্তি এবং হিলারি-দীপু চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দেশকে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের হাতে সঁপে দিয়েছে। কনোকো ফিলিপসের সাথে সমূদ্র ব্লক তুলে দেয়াসহ নানা সামরিক চুক্তির মাধ্যমে দেশে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। দেশকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিণত করছে। সমূদ্র সীমা নির্ধারিত হওয়ার পর মহাজোট সরকার আগামী নির্বাচনের আগে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের তুষ্ট করার জন্য শীঘ্রই এসব ব্লক বরাদ্দের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এভাবে হাজারো পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সরকার মূলতঃ সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তাদের এদেশীয় দালালদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করে চলেছে।

সংগ্রামী জনতা,
আজ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, মহাজোট সরকার বিগত সেনা সমর্থিত সরকারের সা¤্রাজ্যবাদী নীলনকশার কর্মসূচীর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। তারা বিগত চার দলীয় জোট গণপ্রতিরোধের মুখে যে সব গণবিরোধী পদক্ষেপ এগিয়ে নিতে পারেনি তা-ও বাস্তবায়ন করছে। এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মহাজোট সরকার জাতীয় সম্পদ পাচারসহ সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী নীলনকশা বাস্তবায়নের মূল ঠিকাদারের দায়িত্ব পালন করছে। ফুলবাড়ির কয়লা লুণ্ঠন এ নীলনকশা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং অংশমাত্র। কাজেই, ফুলবাড়ির আন্দোলনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করছে যে, সা¤্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তাদের দালাল শাসকশ্রেণীর রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান বজায় রেখে জাতি ও জনগণের স্বার্থ দূরে থাক ফুলবাড়ির কয়লা সম্পদও রক্ষা করা যাবে না। তাই কয়লাসহ জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকে আজ সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও তাঁবেদার শাসকশ্রেণীকে উৎখাতের মাধ্যমে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের স্বাধীন-সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।  আজ ফুলবাড়ির কয়লাসহ দেশ ও জাতিকে রক্ষার স্বার্থে তাদের দেশী-বিদেশী গণশত্র“দের নীলনক্শা বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক মহান কর্তব্য হাজির হয়েছে।
এ মহান লক্ষ্যেই আজ ফুলবাড়ির সংগ্রাম, জাতীয় সম্পদ রক্ষার সংগ্রামকে পরিচালিত করা প্রয়োজন। নতুবা জনগণের সংগ্রাম, শহীদের আত্মদান বৃথা যাবে।

সংগ্রামী জনতা,
সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের অনুগত বহুদলীয় জিসিএম কোম্পানী রংপুরের বিভিন্ন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবর্ধনা দিয়েছে। তার ধারাবাহিকতায় জিএম কাদেরের নেতৃত্বে ৩৮ জন এমপি উন্নয়নের নামে কয়লা বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য দাবী তুলেছে। কুখ্যাত জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক এলাহী উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির পক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে কর্মশালা করেছে। এসব কিছু প্রমাণ করছে বিগত নির্বাচন ছিল নীলনকশার ও সমঝোতার নির্বাচন এ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধি নয়, সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি দেশীয় দালালরা নির্বাচিত হয়েছে। সুতরাং, এটা এ সত্য তুলে ধরছে, নির্বাচন যত অবাধ ও সুষ্ঠু হোক, ভোট গ্রহণ পদ্ধতি যত আধুনিকায়নই করা হোক, সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও তাদের দালাল শাসকশ্রেণীর অধীনে কোন নির্বাচনে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারে না।
এ অবস্থায় আমরা দেখছি দেশ ও জাতিকে দেশি-বিদেশী শোষণ-লুণ্ঠন-নিপীড়নে বিপন্ন করে তুলে শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলো এখন আগামী  সংসদ নির্বাচনকে তাদের একমাত্র এজেন্ডায় পরিণত করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নির্ধারিত হবে পরবর্তী ৫ বছর কে কত লুটের ভাগ পাবে। ক্ষমতা প্রত্যাশী বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট তথাকথিত ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য জান কোরবান করছে। নির্বাচনে জয় লাভের উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোট ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। চলছে বিদেশী প্রভুদের মনতুষ্টির প্রতিযোগীতা।
এদিকে খালেদা-হাসিনাকে ঘিরে গত বিশ বছর যে নির্বাচিত স্বৈরাচারি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছেÑতা এতটাই অকার্যকর, ভঙ্গুর অবস্থায় পতিত হয়েছে যে, দেশি-বিদেশী শাসকগোষ্ঠী এ রাজনৈতিক ব্যবস্থা সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিগত ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকারের সময়ও ‘মাইনাস টু ফর্মলা’ হিসাবে এ সংস্কারের চেষ্টা করা হয় কিন্তু তা সফল হয়নি। এ রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়াসের অংশ হিসাবে আমরা দেখছি সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট ‘তৃতীয় শক্তি’ গঠনের তোড়জোর। এ শক্তিটিও নির্বাচনকে ঘিরে তৎপরতা শুরু করেছে এবং জোট-মহাজোটের দুঃশাসন থেকে জনগণের মাঝে মুক্তির স্বপ্ন ফেরি করছে।
কতগুলো বামপন্থী বলে পরিচিত দল শাসকশ্রেণীর এ নির্বাচনি খেলায় যুক্ত হয়ে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও শাসকশ্রেণীর দালাল হিসাবে নিজেদের উন্মোচন করছে। এরা আবার ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী’ সেজে, জাতীয় সম্পদ রক্ষার কান্ডারি হিসাবে জাহির করে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।
এভাবে শাসকশ্রেণীর নানা দল-উপদলগুলো দেশি-বিদেশী নীলনকশা আড়াল করছে। জনগণকে মুক্তির প্রকৃত পথ থেকে সরিয়ে নির্বাচনের মায়ামোহে মোহগ্রস্থ করতে চাইছে।
তাই ফুলবাড়িসহ সমগ্র জাতি ও জনগণের প্রতি আমাদের আহ্বান মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ এবং তার দালাল শাসকশ্রেণীর পরিচালিত নির্বাচন ও সংস্কারের মোহময় পথ বর্জন করুন। ভারতের লালগড়, নন্দীগ্রাম থেকে শিক্ষা নিন! ঝড়ো গণসংগ্রাম গড়ে তুলুন! গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় মহল্লায় সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন! সর্বত্র প্রতিরোধের দূর্গ গড়ে তুলুন!
সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি ও সংগঠনসহ ব্যপক শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণের প্রতি আমাদের আহ্বান, আসুন, ফুলবাড়ি আন্দোলনের ৬ দফা সমঝোতা চুক্তি অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবীতে সোচ্চার হই! মহাজোট সরকারের ফ্যাসিবাদী ও তাঁবেদারী শাসন এবংসাম্রাজ্যবাদী নীলনক্শা বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই! কয়লাসহ জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও তাঁবেদার শাসকশ্রেণীকে উৎখাতের মাধ্যমে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের স্বাধীন-সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের দিকে এগিয়ে নিন!

জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন