হিলারির সফর এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির প্রাথমিক পর্যালোচনা

গত ৫ মে ২০১২ চীন হয়ে বাংলাদেশে সফরে আসেন হিলারী ক্লিন্টন। ২৬ এপ্রিল ২০১২ হঠাৎ করেই মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এ ‘বিশেষ’ সফরের কথা ঘোষণা করে। সফরকালে হিলারী প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপের চুক্তি স্বাক্ষর শেষে একটি যৌথ ঘোষণা গৃহীত ও তা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। এরপর হিলারী বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথে বৈঠক করেন। দ্বিতীয় দিন গ্রামীণ ব্যাংক ও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনুস ও ফজলে হাসান আবেদের সাথে বৈঠক করেন হিলারি। এরপর তিনি ‘বাংলাদেশের সাথে আড্ডা’ (A Conversation with Bangladesh) শীর্ষক একটি আলোচনা/মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্বাচিত শতাধিক তরুণ-তরুণী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেয়। মার্কিন দুতাবাসের আয়োজিত এই অনুষ্ঠান এটিএন নিউজ সরাসরি সম্প্রচার করে। ইন্টারনেটে অনুষ্ঠানটির পূর্ণ ভিডিও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। সংবাদ মাধ্যমের কাছে হিলারী তার বক্তব্যে প্রধানত তিনটি প্রসঙ্গে মতামত তুলে ধরেন: এক. রাজনীতিতে সংকট নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। দুই. বাংলাদেশে সুশীল সমাজের বিকাশ ব্যহত করা চলবে না। তিন. শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের গুমের ঘটনায় মার্কিনীরা উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সফর শেষে হিলারী ভারত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান।

একই সময় বাংলাদেশ সফর করতে আসেন ভারত সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি, এই সময়ের ‘চাণক্য’, অর্থমন্ত্রী প্রণব মূখার্জী। বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে তার আগমন। যদিও অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণ ছাড়াও সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, কয়েকজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং কয়েকজন সম্পাদকের সাথে মতবিনিময়ের নামে একান্তে বৈঠক করেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্যে ১০০ কোটি ডলার ঋণে বাংলাদেশের জন্য বিবেচনাধীন সুবিধাসমূহ, আসন্ন নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ, কোন দলবিশেষ নয় বরং বাংলাদেশের জনগণের সাথে বন্ধুত্ব, হাসিনা-মনমোহন যৌথ ইস্তেহার, তিস্তা চুক্তি, সিমান্তে বাংলদেশের নাগরিক হত্যা ইত্যাদি প্রসঙ্গে কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। বাংলাদেশে হিলারির সফরের সময় প্রণব মূখার্জির আগমন বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক ও সিদ্ধান্ত যে বর্তমানে ভারতকে এড়িয়ে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না-তারই ইঙ্গিত বহন করছে।

হিলারির এই আগমন এবং পুরো ব্যাপারটার মধ্যে কয়েকটি দিক আছে। তার মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিকটিই হল প্রধান। ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বিচারে এই সময় আনÍর্জাতিকভাবে একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যে কারণে হিলারির ঢাকায় আসার বিশেষ প্রয়োজন পড়েছে।

এটা আজ পরিস্কার যে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে চীন রাজনৈতিকভাবে মার্কিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দী সুপার পাওয়ার হয়ে উঠতে পারে। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সামরিক, অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। লোহিত সাগরে বাব এলমান্দের চেক পয়েন্ট, ইরান উপকূলে হরমুজ প্রণালীর চেক পয়েন্ট, মালয়শিয়ার উপকূলে মালাক্কা প্রণালীর চেক পয়েন্ট, ইন্দোনেশিয়া উপকূলে লম্বোক প্রণালীর চেক পয়েন্ট, শ্রীলংকার পক প্রণালীর চেক পয়েন্ট, পাকিস্তানের গোয়েদারে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বন্দর, মালদ্বীপ, শ্রীলংকার হাম্বানটোটা, মায়ানমারের সিটাওয়ে ও রেঙ্গুনে বন্দর ইত্যাদিসহ প্রসান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় চীনের ভূ-সামরিক কৌশলগত অবস্থান ও স্থাপনার ক্রমবর্ধমান সজ্জা পরিকল্পনা নির্দিষ্ট রূপ নিয়েছে। এসবের কোনটা ঘাঁটি, কোনটা রাডার স্টেশন, কোনটা ইলেক্ট্রনিক বা তথ্য সংগ্রহের স্টেশন ইত্যাদি। মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞরা এ অঞ্চলে চীনের সামরিক অবস্থানগুলোকে সংযুক্তভাবে ‘মুক্তার হার’ বা ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এছাড়াও চীন মায়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের স্থলভাগ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি পথ নির্মাণের কাজ করছে। এভাবে স্থল ও সমূদ্র পথে এসব স্থাপনাগুলোকে একটি সমন্বিত সংযোগ নেটওয়ার্কের অধীনে আনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশে বহিঃসমূদ্র বন্দর নির্মাণে চীনের তৎপরতা, প্রচেষ্টা চলমান আছে। এমনিভাবে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে মার্কিনীদের অত্যাবশ্যকীয় আধিপত্য খর্ব করার কারণ ও হুমকী হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মন্দার প্রেক্ষিতে ইরাক-আফগান যুদ্ধে উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী। এখন এ বাহিনী অন্যত্র সরিয়ে নেয়া ছাড়া মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদের অন্য কোন উপায় নেই। এমন কি ইরাক-আফগানিস্তানে আগ্রাসনের চেয়ে অনেক নিচু মাত্রায় সামরিক বহর ও তৎপরতা পরিচালনা করাও এখন এসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায়/বহাল রাখার শক্তি অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক মন্দা মার্কিনকে আরো দুর্বল করছে।

এঅবস্থায় চীন, ভারতসহ এ অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া এবং বাংলাদেশও একটি বিকাশমান অর্থনৈতিক এলাকা হিসেবে হাজির হয়েছে। আগামী দিনে ‘বিশ্ব প্রবৃদ্ধি’র চালকের ভূমিকায় এ অঞ্চলকেই বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে, এ অঞ্চলে মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদ ও অন্যান্য শক্তি নিজেদের প্রভাব পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করতে, নিয়ন্ত্রন আরো বাড়িয়ে তুলতে বা একচেটিয়া করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সামরিক শক্তির অধিকতর কৌশলী ব্যবহার করে ভূ-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষা ও চীনকে ঘেরাও করার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নানাভাবে উদ্যোগ নিচ্ছে। সিংগাপুরে হোটেল সাঙ্গরিলা কনফারেন্সে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন পেনেট্টা বর্র্ণিত মার্কিন সামরিক/প্রতিরক্ষা কৌশলের মধ্যে তারই প্রকাশ ঘটেছে। সেখানে মার্কিনীরা আশু সামরিক পরিকল্পনায় তাদের নৌ সামরিক শক্তির অধিকাংশটা (অন্তত শতকরা ৬০ ভাগ) এ অঞ্চলে নিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বাংলাদেশে (বঙ্গোপসাগরে) তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।

চীন এখানে দৃশ্যত যে নীতি গ্রহণ করেছে সেটা হলো সংঘাত এড়িয়ে তাদের কার্য উদ্ধারের নীতি। চীন এমনও আশা করে যে আন্তর্জাতিক মন্দার কারণে অন্তর্গতভাবে মার্কিনের সে সামর্থ নেই যা চীনের অগ্রগতিকে আটকাতে পারবে। তাই চীন কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে না। যদিও মাঝে মাঝে মার্কিন তৎপরতার বিপরীতে পাল্টা হুমকী প্রদান করে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। কিন্তু, দৃশ্যত তাকে উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। বরং মার্কিনীরা উদ্বিগ্ন এবং তারা ঘোষিতভাবেই চীনকে ঘেরাও করার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে আশু স্বার্থ ও উদ্দেশ্যের মিলের কারণে এ অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঘনিষ্টতম সহযোগী হিসেবে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ২০০৫ সাল থেকে সুস্পষ্টভাবে ও ক্রমবর্ধমান মাত্রায় ভুমিকা পালন করছে। কিন্তু অন্যদিকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ এ অঞ্চলে নিজের কৌশলগত গুরুত্ব বজায় রাখতে এখানে মার্কিনের প্রত্যক্ষ সামরিক-রাজনৈতিক প্রবেশকে সমর্থন করে না। সে চায় মার্কিনীরা তার উপর নির্ভর করুক। এসবই হলো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত যার আলোকে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা দরকার।

এই পটভূমির আলোকেই আমাদেরকে হিলারী ক্লিন্টনের বাংলাদেশ সফর, সমুদ্র সীমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদলতের রায়সহ দেশীয়-আঞ্চলিক ঘটনাবলীকে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশসহ দক্ষিন এশিয় অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক এবং সামরিক দ্বন্দ্ব ঘনীভুত হচ্ছে। ইরাক, আফগানিস্তানে একসময় আরবকে কেন্দ্র করে যেভাবে সাম্রাজ্যবাদী দন্দ্বসমুহ ঘনীভূত হয়েছে, এখন একই গুরুত্বসহকারে সে দ্বন্দ্ব যেন এ অঞ্চলে ঘনীভূত হচ্ছে। একদিকে চীনের সাথে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়াসহ অন্যান্য শক্তি এবং অপরদিকে মার্কিনের সাথে অন্যান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যুক্ত হয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে । এভাবে সাম্রাজ্যবাদের আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বসমুহের কেন্দ্র হিসেবে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতি ঘনীভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় সমূদ্র যোগাযোগের সুবিধাসহ বাংলাদেশ ভারত-বার্মা-চীন ভূখন্ডের একেবারে গভীরে এবং সংলগ্ন অবস্থানে রয়েছে। ফলে চীন ও মার্কিন ভারত দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষগুরুত্বপূর্ণ। চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ ও অন্যান্য কৌশলগত সামরিক স্থাপনার সম্ভাব্য লক্ষ্য হল চট্টগ্রাম। সেখানে বাংলাদেশ এর উপর সামরিক, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রশ্নটা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদেশের বুর্জোয়া সামরিক বিশ্লেষক, বিশেষজ্ঞরাও এ অবস্থা স্বীকার করছে। তবে এসব বুদ্ধিজীবী, বিশ্লেষকদের দালাল চরিত্র ধরতে না পারলে জাতি তাদের প্রতারিত হতে পারে। তাই এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলে রাখা দরকার।

এসব আত্মমর্যাদাহীন দালাল ‘বিশেষজ্ঞ’রা যুক্তি দেখাচ্ছে যে, আমাদের নিজস্ব কারণে যতটা না, তার চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক কারণে এবং একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ে যখন বিশ্বব্যবস্থায় সঙ্কটগুলো দেখা দিচ্ছে, চীনের উত্থান হচ্ছে সেরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক পাওয়ার, সুপার পাওয়ারের ক্ষমতার খেলার (power game) মধ্যে সে একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ফেলছে। তারা জনগণের সামনে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে চাচ্ছে যে, এটা বিপদ নয়, একটা সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাদেরকে সর্বাধিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। আমাদের কাজ হল কোন একদিকে ঝুঁকে না পরে মার্কিন, ভারত, বার্মা ও চীনের সাথে কূটনেতিক ভারসাম্য রক্ষা করে সর্বোচ্চ স্বার্থ আদায় করা।

এসব বুদ্ধিজীবীদের মতামতের মধ্যেই এদেশের দালাল শাসকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি নগ্নভাবে প্রকাশ পায়। এদের মনোভাব হচ্ছে সবার উপরে সত্য হল ‘অধিক লাভ’। সুতরাং দেশের যাই হোক, অধিক দরেই দেশবিক্রি কর।

দেশে বহিঃশক্তির সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা গড়ে উঠলে জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর তাদের কর্তৃত্ব আরও সম্প্রসারিত হবে। এমনকি তাদের সামরিক স্বার্থের বিবেচনায় আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানা বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। দেশ সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বীতা ও যুদ্ধের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। বহিঃসমূদ্রে কার্যত বহিঃশক্তির দখল কায়েম হতে পারে। এতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লুণ্ঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে পূর্ণ উপনিবেশেই পরিণত হবে তা নয়, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ-সংঘাতের নিরাপরাধ বলি হবে এ জাতি ও জনগণ। কিন্তু দেশের যাই হোক, সাধারণ মানুষের যাই হোক, যুদ্ধ লাগলে লাগুক- তা এসব শাসক শ্রেণীর বিবেচ্য নয়। যুদ্ধটাকে দরকার হলে তারা বেশি দামে বিক্রি করবে। নিজেরটা ছাড়া এ শাসকশ্রেণী কিছইু বুঝে না। তাই বাংলাদেশ যে কতগুলো বহিঃশক্তি ও সুপার পাওয়ারের লীলা ক্ষেত্রে পরিণত হতে যাচ্ছে, সেটা তাদের জন্য বিরাট অপরচ্যুনিটি বা সুযোগ। জনগণের সামনে একে তারা ইতিবাচক বিষয় হিসাবে তুলে ধরছে এবং আসন্ন অর্থালাভের স্বপ্নে তাদের লালা ঝড়তে শুরু করেছে। তাই এ সুযোগের সদব্যবহার করাই তাদের প্রধান কৌশল। দেশ যেখানেই যাক, কার কাছে বেশি দামে বিক্রি করলে আমি সর্বোচ্চ লাভবান হতে পারি, এটাই আসল প্রশ্ন। এ জন্য সফল দরকষাকষির নাম শাসকশ্রেণীর কাছে কূটনেতিক সাফল্য। এ মরণ খেলায় নেমে একটা জাতি, সমাজ যে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে- সেটা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের দাসোচিত মনোভাব হল বহিঃশক্তি এখানে তো খেলবেই, এটা মেনে নাও। শহরতো পুড়বেই,  সুতরাং ভাব ছাই কার কাছে বিক্রি করবো-এরকমই তাদের চিন্তাভাবনার ধারা। তারা এটা একবারও উল্লেখ করছে না যে এই খেলাটা বহিঃশক্তিগুলো নিজেদের জঘন্য স্বার্থে খেলছে। জঘন্য সা¤্রাজ্যবাদী লালসা থেকে এ খেলা উৎসারিত। মার্কিন, ভারত, চীন সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, এগুলোর পেছনে জনগণের অর্থ ব্যয় করছে, যুদ্ধ তৈরী করে এখানকার জনগণের রক্তপাত করার ব্যবস্থা করছে-এর সাথে যেন ভালো-মন্দ বা ন্যয্যতার কোন প্রশ্ন জড়িত নয়। এ যেন শুধু ক্ষমতাবানের ক্ষমতার খেলা-এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলাই অবান্তর।

একটা আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতি তার দেশকে বহিঃশক্তির লীলাক্ষেত্রে পরিণত হতে দিতে পারে না। কিন্তু দালাল শাসকশ্রেণী বলতে সক্ষম নয়-‘এটা আমাদের মাটি-তোমরা হাতগুটাও’। তারা বলতে সক্ষম নয় যে, ‘এ জঘণ্য অন্যায্য খেলা তোমাদের বন্ধ করতেই হবে’। একথা বলার মতো আত্মমর্যাদা এসব দালাল বুদ্ধিজীবীদের নেই। বরং তারা তাদের ডেকে আনতে পারলে খুব খুশি। এই হচ্ছে প্রথম আলো, তাদের সাংবাদিক মিজানুর রহমান, সামরিক বিশ্লেষকদের অবস্থা। এই ন্যাক্কারজনক অবস্থানটা এখানকার সুশীল সমাজের। এ ঘটনার প্রমাণ দিয়ে এটা আজ পরিষ্কারভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা দরকার যে, এদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্টিত আছে যে শ্রেণীগুলো তারা স্বার্থের কারণে কতটা দেশবিরোধী হতে পারে, জাতি ও জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে এবং তাদের সুশীল বুদ্ধিজীবী লোকগুলোর চরিত্রই বা আসলে কি। মিজানুর রহমান খান চমৎকার সুশীল বাংলায় কথা বলেন কিন্তু তার মূল নীতি মোটেও সুশীল নয়, ক্রিমিনাল। এটাই শাসকশ্রেণী আর তার বুদ্ধিজীবীদের চেহারা। একে উন্মোচন করা এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াটা খুব জরুরী।

এসব পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিতভাবেই গত ৫-৬ মে এদেশে হিলারি ও প্রণবের সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৬ জুন ২০১১ পিএসসি’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে আদতে মার্কিন কোম্পানী কনোকো ফিলিপসের হাতে সমূদ্রের মালিকানা তুলে দেয়া হয়েছে। ১৪ মার্চ ২০১২ সমূদ্র সীমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালতের রায় ঘোষিত হয়েছে। এই সমূদ্র এলাকায় শুধুমাত্র তেলগ্যাস আহরণই নয়, একই সাথে সামরিক তৎপরতার জন্য দরকারি বন্দরের যে প্রশ্ন তাও দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে। ২৭ ডিসেম্বর ২০১১ মেগা সী পোর্ট বা গভীর সমূদ্র বন্দর নির্মাণ প্রক্রিয়ার উদ্বোধন করা হয়েছে। এ ধরণের পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য ও বিভিন্ন দিক ক্রমেই আরো পরিস্কার হয়ে উঠছে। হিলারী ও প্রণবের বাংলাদেশ সফরের সপ্তাহান্তেই খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, সমুদ্রসীমায় মার্কিনের ৭ম নৌ বহর আসছে। এভাবে মার্কিন নৌ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার লক্ষণ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের উদ্বিগ্নতার যে প্রকাশ ঘটেছে তা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কেন সুনির্দিষ্টভাবে এ ধরনের সংবাদ ভারত থেকে প্রচার করা হলো তার নানা উদ্দেশ্য থাকাটাই স্বাভাবিক। হিলারীর সফরে ভারতের অজ্ঞাতে সরকারের সাথে মার্কিনীদের কোন বিশেষ গোপন চুক্তি হয়েছে কি না, তা জানার অংশ হিসাবে এমন খবর প্রকাশ করা হয়ে থাকতে পারে। এমনও হতে পারে যে, ভারতের শাষক শ্রেণীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব’র কারণে তাদের কোন অংশ এই সত্যকে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের সাথে ইতিপূর্বেও মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন দেশ ও ভারতের সাথে অনেকগুলো সামরিক চুক্তি হয়েছে, যেগুলো গোপন। সেই ১৯৯১ সাল থেকে যেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার বিভিন্ন সংস্থার সাথে এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে সম্পাদিত বিভিন্ন সামরিক-রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক চুক্তি ও তৎপরতার মাত্রা লাগাতারভাবে বেড়েছে। ২০০৭-৮ সাল থেকে যার বিশেষ উল্লম্ফণ ঘটেছে। তার পরম্পরায় কখনো কখনো বিনা পাসপোর্টে ভারী অস্ত্রসহ ঢুকে যাওয়া, লঘু মাত্রার সামরিক অপারেশন চালিয়ে কাউকে কাউকে বিনা বাধায় দেশের ভেতর থেকে তুলে নিয়ে যাবার ঘটনা, বহুবৈচিত্রের ধারাবাহিক যৌথ সামরিক মহড়া, সামরিক সংলাপ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মার্কিন-ভারতের এক ধরনের গোপন সামরিক উপস্থিতির প্রকাশ ঘটেছে। ঘুর্ণিঝড় সিডরকে অজুহাত করে ২০০৭ সালের নভেম্বর থেকে বাগেরহাটে উপকূলীয় এলাকায় বিমান ও হেলিকপ্টারবাহী উভচর প্রকৃতির দুটি মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ অ্যাসেক্স ও কিয়ারসার্জ প্রায় ছয় মাস অবস্থান করে। । সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে সামরিক প্রশ্নকে প্রাধান্যে রেখে বানিজ্য ও সহযোগিতা কাঠামো অর্থাৎ, টিফা বা টিকফা চুক্তির জন্য মার্কিনীদের ধারাবাহিক চাপ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তা স্বাক্ষর ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দ্রুততার সাথে চলমান। জাতিসংঘের শান্তি বাহিনী, বহু বিচিত্র প্রশিক্ষন, তথাকথিত দি-পাক্ষিক, বহুপাক্ষিক সফর, সহযোগিতা ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে অনেক আগেই মার্কিন বাহিনীর বর্ধিত অংশ বা বি টিমে পরিনত করা হয়েছে। এসব নানামূখী তৎপরতার কথা বিভিন্ন সময় আমরা তুলে ধরেছি।

সফরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ অংশীদারিত্বমূলক কৌশলগত সংলাপের যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে-তা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। ইতিপূর্বের ধারাবাহিক যৌথ সামরিক তৎপরতা ও সামরিক সংলাপসমূহের সামগ্রিক ও সর্বশেষ পরিণতি এ চুক্তি। সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে মার্কিন সামরিক স্বার্থ, তেলগ্যাস, বন্দর ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা- এ চুক্তির মূল লক্ষ্য। এ চুক্তির ফলে মার্কিন স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এদেশে মার্কিনের সাথে আলোচনার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এসব বিষয়ে তাদের সম্মতি বা আলোচনা এড়িয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হবে না। এভাবে চুক্তির নামে বাংলাদেশের উপর  মার্কিন কর্তৃত্ব আরো সুদৃঢ় করা হলো। সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশিক অধিকৃতির একটি প্রকাশ হল চুক্তির বলে নিপীড়িত দেশের উপর সাম্রাজ্যবাদের বিশেষ অধিকার ভোগ। আমরা মার্কিনের আধা-উপনিবেশিক নিপীড়নে নিপীড়িত একটি জাতি-এ চুক্তি তারই বহিঃপ্রকাশ।

ভূ-রাজনৈতিক-স্বার্থটি হিলারি সফরের প্রধান দিক ছিল। কিন্তু আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তার কেন্দ্রীয় ইস্যু ছিল- শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক সংস্কার।

সা¤্রাজ্যবাদের বর্ধিত চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে শাসক শ্রেণীর বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো এবং পুরো সমাজ ব্যবস্থাকেই পুনর্গঠন করা জরুরী হয়ে পড়েছে বেশ আগেই। এক এগারোর মাধ্যমে বহিঃশক্তিগুলো কর্তৃক সরাসরি প্রতিষ্ঠিত ও নির্দেশিত ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার সেই পুনর্গঠনের নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। তার পরম্পরায় মহাজোটের উপর তা এগিয়ে নেবার দায়িত্ব বর্তেছে। তারা দ্রুততার সাথে তা অনেক দিকে এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তুঅনেকটা সময় পার হবার পরও সামগ্রিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখনও অসম্পুর্ণ রয়ে গেছে। এই পুনর্গঠনের কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ রাজনৈতিক সংস্কার ‘মাইনাস টু’ অসম্পুর্ণ থেকে গেছে। এতে সাম্রাজ্যবাদের প্রক্রিয়ার কাঙ্খিত অগ্রগতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যহত হচ্ছে। 

এদেশে শাসক শ্রেণীর বিদ্যমান শাসন কাঠামো অর্থাৎ, তথাকথিত সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটা স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ব বিকশিত হয়েছে। এর আগে ছিল সামরিক স্বৈরতন্ত্র। এরশাদের পতনের পর তা পুনর্গঠিত হয়, কিন্তু স্বৈরতন্ত্র নতুন রূপ ধারণ করে। দুই দশক ধরে পালাক্রমে শাসক শ্রেণীর দুটি অংশ শাসন ক্ষমতায় আবর্তিত হলেও এদেশের সংবিধানসহ সার্বিক রাজনৈতিক কাঠামো- এ নতুন রূপের স্বৈরতন্ত্রকে রূপ দিয়েছে। এখন সেটা সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। যেখানে সামরিক বাহিনী একটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু পরোক্ষ ভূমিকা রাখে।

কিছু মাত্রাগত পার্থক্য থাকলেও ইরাক, সিরিয়া, মিশর, তুউনিসিয়াসহ আরব দেশসমূহের স্বৈরতন্ত্র, এদেশের বেসামরিক ধরণের স্বৈরতন্ত্র থেকে ভিন্ন কিছু নয়। এসব দেশেও সংসদ স্বৈরাচারের আজ্ঞাবহ বা অকার্যকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশগুলোতে সা¤্রাজ্যবাদী ঋণ ও সাহায্যপুষ্ট, প্রবৃদ্ধিমুখি রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। এ অর্থনীতির সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণভাবে গড়ে ওঠে এসব দেশের শাসকশ্রেণীর শাসন ব্যবস্থার চরিত্র: সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের উপর দাঁড়ানো স্বৈরতন্ত্রের নানারূপ।

একসময় সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের তীব্র শোষণ-নিপীড়ন উল্লেখিত দেশেগুলোর অর্থনীতি ও রাজনীতিকে দেউলিয়াগ্রস্ত করে তোলে। জনগণের মধ্যে বিপ্লবী সংগ্রাম তীব্রতর হয়। এ অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ তার পলিসি পরিবর্তন করে। নিপীড়িত দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্থলে বাজার অর্থনীতি চালু করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পুরনো একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সুবিধাভোগী বিদ্যমান স্বৈরতান্ত্রিক-আমলাতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সাম্রাজ্যবাদী ‘নিও লিবারেল’ অর্থনীতিক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন হয় ‘লিবারেল’ রাজনীতিক শাসন ব্যবস্থা। ১৯৯০ সাল থেকে গ্লোবালাইজেশনের নামে সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে রীতিমত উল্লম্ফন ঘটে। কিন্তু এ পুনর্গঠন পরিপূর্ণতা পায় নি। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে এরশাদ পতনের পর এ ব্যবস্থার কিছু সংস্কার হলেও তা যে যথেষ্ট হয়নি তা সংসদীয় রূপের স্বৈরাচারের আবির্ভাব থেকেই স্পষ্ট হয়।

২০০০ সাল থেকে সাম্রাজ্যবাদী সংকট তীব্রতর হওয়ায় দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদের অধিকতর অনুপ্রবেশের প্রয়োজন দেখা দেয়। শাসকশ্রেণীর শাসন ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও আরও তীব্রতর হয়েছে। কারণ সাম্রাজ্যবাদী বহিঃশক্তিসমুহের পুনর্গঠন উদ্যোগে স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ এ ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাটার পরিবর্তে বাজার ব্যবস্থার মত রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে একটি অংশগ্রহণমূলক ও মুক্ত প্রতিযোগীতাভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকারের সময় তারা রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য গুরুতর পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু সেটাকে এগিয়ে নিতে পারেনি। এখনও সে প্রক্রিয়া চলমান আছে। ডান, বাম, ইসলামি, নাগরিক, এনজিও, সুশীল, সামাজিক আন্দোলন, যুব আন্দোলন, শ্রমিক সংগঠন, মিডিয়া ইত্যাদি রঙবেরঙের সংস্কারপন্থীরা তৎপরতা অব্যহত রেখেছে। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এ প্রচেষ্টা মিশর, তিউনিসিয়া স্টাইলের ‘আরব সংস্কারের’ পথ পরিগ্রহ করতে পারে। বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত যে সমস্ত শক্তি, ব্যক্তি, গ্রুপ, সংগঠন ইত্যাদি কাজ করছে তাদের মধ্যে ঐক্যের জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা দূর করে একক শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সফরকালে হিলারী ক্লিন্টন বিশেষ সাক্ষাতের মাধ্যমে সংস্কারপন্থীদের মধ্যে মার্কিনের পছন্দ এবং খোদ আশীর্বাদপুষ্ট শীর্ষ ব্যক্তি হিসাবে ড. ইউনুস এবং ফজলে আবেদকে নিশ্চিত ও প্রতিষ্ঠা করেছেন। সম্ভবত এভাবে সাম্রাজ্যবাদের অনুগত তাদের নেতৃত্ব কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সাম্রজ্যবাদী এ রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পক্ষে সহায়ক এমন শক্তি শাসক শ্রেণীর মধ্যেই রয়েছে। এদের একাংশ সা¤্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ দান-খয়রাতের উপর নির্ভরশীল। আরেকাংশ নিজেদের বিদ্যমান স্বৈরাচারি শাসন ক্ষমতার কারণে ঘি-মাখন থেকে বঞ্চিত বলে মনে করে। সাম্রাজ্যবাদের মদদ লাভ করে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এ জন্য সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে। এভাবে সা¤্রাজ্যবাদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাযোসে নানান ধরনের শক্তি এ রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় নানাভাবে সামিল হয়েছে। সুশীল সমাজ, সিএসও এবং এনজিওদের মধ্যে ব্র্যাক, গণস্বাস্থ্য, সিপিডি, আইন ও সালিশী কেন্দ্র, টিআইবি, সুজন, বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় নাগরিক কমিটি, এমনি অনেক এনজিও, অন্যান্য এনজিওসমূহ, প্রথম আলো, ডেইলীস্টার, সমকাল, বুধবার, প্রথম আলো ব্লগ, আলোর মিছিল, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, সম্প্রতি সরাসরি মার্কিন তত্ত্বাবধানে সৃষ্ট তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন যেমন- বাংলাদেশ তরুণ নেতৃত্ব কেন্দ্র (BYLC), জাগো ফাউন্ডেশন ইত্যাদি এই প্রক্রিয়ায় সম্পর্কিত শক্তি হিসেবে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে । একই সাথে আছে সুকৌশলে সাম্রাজ্যবাদ, রাষ্ট্র ও শাসক শ্রেণীর নানা অংশের পৃষ্টপোষকতায় পুষ্ট ধারণা ‘তৃতীয় শক্তি’র সাথে সম্পর্কিত তথাকথিত প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক, ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক এদের সমন্বিত নানান ধরনের নাগরিক সংগঠন যেমন, মাহমুদুর রহমান মান্না-আসিফ নজরুলদের নাগরিক ঐক্য, রফিকুল হক-পিয়াস করিম-নুরুল কবিরদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য নাগরিক কমিটি, এখনও সামনে আসে নাই কিন্তু প্রক্রিয়াধীন নাগরিক কমিটি ধরনের একাধিক সংগঠন। ফরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকারের কিংস পার্টি ফেরদৌস কোরেশীদের পিডিপি, ড: কামালের গণফোরাম, বদরুদ্দোজা চৌধুরীদের বিকল্পধারা, আসম রবের জাসদ, মালেক রতনের জাসদ, এরকম বিভিন্ন ধরনের বেশ কিছু ছোট ছোট রাজনৈতিক দল ইত্যাদিও এ ধরণের তৎপরতায় তাদের অংশীদারিত্বের প্রমাণ আগেই রেখেছে। অন্যদিকে রয়েছে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে সম্মিলিত ইসলামী আন্দোলন নামে একগুচ্ছ ইসলামী সংগঠন, শক্তি যারা ইতিমধ্যে বড় আকারে জনসমাবেশ করে শক্তির মহড়া দিয়েছে ও অপরদিকে বামপন্থীদের মধ্য থেকে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির শ্লোগান দেয়া এনজিওদের সাথে যুক্ত বিভিন্ন বাম দল যেমন, সিপিবি, জাসদ, ওয়াকার্স পার্টি ও আরো বেশ কয়েকটি বাম দলেরও এই প্রক্রিয়ার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমন্বিত-সম্পর্কে যুক্ত হবার সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে। আওয়ামীলীগ ও বিএনপির মধ্যেও সংস্কারপন্থী হিসাবে পরিচিত অংশ রয়েছে, যারা উপযুক্ত সময়ে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে। এসব শক্তি অতি বৈচিত্রময়। মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী লবিগুলোর দ্বন্দ্ব এবং ঐক্য এদেও মাঝে প্রতিফলিত হয়। এছাড়া মতাদর্শগত বিরোধও রয়েছে। ফলে আপাত দৃষ্টিতে এদের কখনো কখনো পরস্পর বিরোধী মনে হলেও-লক্ষ্য করলে এদের মূলগত ঐক্য সনাক্ত করা যায়। এই যে একটা শক্তি বিকাশের প্রচেষ্টা চলছে সেটি আগামী নির্বাচনে একটা ভুমিকা নেবার উদ্দেশ্য নিয়ে এগুচ্ছে। নির্বাচনসহ ভিন্ন অন্য উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। আরবের মত সংস্কার আন্দোলন সৃষ্টির উদ্দেশ্যও তারা সংগঠিত হতে পারে। তবে যে পথেই অগ্রসর হোক, সাম্রাজ্যবাদী সংস্কার প্রয়াস অব্যহত থাকবে। তবে এ পুনর্গঠন কত সময় নেবে, কতটা মাত্রায় ও কি রূপ নেবে তা শক্তিগুলোর বাস্তব ভারসাম্যের উপর নির্ভর করছে। সুতরাং এটুকু বলা যায় শাসকশ্রেণীর রাজনীতি যে সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে যাচ্ছে তাতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেলেন হিলারী।এদিকে হিলারি খালেদা জিয়ার সাথে দীর্ঘ সময় নিয়ে বৈঠক করেন। একই সময়ে প্রণব মূখার্জি ঘোষণা করেন যে, ভারতের সম্পর্ক হল বাংলাদেশের সাথে; কোন বিশেষ দলের সাথে নয়। সুতরাং এ সফরে হাসিনা সরকারের প্রতি বৈদেশিক প্রভুদের দূরত্ব ও উষ্মারই বহিঃ প্রকাশ ঘটেছে। হাসিনা সরকার হতে তারা আরও বেশি কিছু আদায়ের জন্য হাত মোচড়াচ্ছে। সুতরাং শীঘ্রই এ সরকার নিজেদের স্বার্থে আরও জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকা- বাস্তবায়ন করবে।সুতরাং, ভূ-রাজনৈতিক-সামরিক স্বার্থ হিলারীর সফরের প্রধান দিক হলেও এদেশের অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক সংস্কার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো বড় আকারে সামনে আসেনি। কারণ সেগুলো আসন্ন টিকফা চুক্তির মাধ্যমে বা আগের প্রক্রিয়াতেই এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, হিলারীর এ সফরে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এ কারণে হিলারী সফর পরবর্তীতে খুব দ্রুতই মার্কিন রাষ্টদুত ড্যান মজিনাসহ আরও অনেকে তৎপর হয়ে উঠেছেন। তারা অব্যাহতভাবে তরুণ নেতৃত্ব বিকাশ ও তাদের করণীয়, এলাকায় এলাকায় সুশীল সমাজের সাথে আলোচনা ইত্যাদি করছেন। সুশীল সমাজ ও এনজিও উদ্যোগে পরিচালিত ‘যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন’- ধরণের কাজ হাতে নিয়েছেন। এ জন্য দেশব্যাপী সফর করছেন।মিশরে ২০০৫ সালে মোবারক বিরোধী আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। একে বলা হয় ‘কিফায়া’ বা ‘যথেষ্ট’। অর্থাৎ মোবারকের শাসন যথেষ্ট হয়েছে-আর নয়। এসময় থেকেই রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন তৈরী করা হয়েছে মিশরে। সেখানে বিভিন্নমূখী গ্রুপগুলো থেকে মধ্য বাম, ডান, ইসলামিক শক্তি সবগুলোকে একত্র করে মোর্চার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেয়া হয়েছে। সে আন্দোলনের ব্যর্থতা থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সংশ্লিষ্ট থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো শিক্ষা নিয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করে। তার ভিত্তিতে মিশরে ২০১১-এর সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করা হয়। ‘১৬ এপ্রিল যুব আন্দোলন’ একটি রাজনৈতিক এনজিও বা সিএসও; যারা মিশরের সাম্প্রতিক সংস্কার আন্দোলনে সংগঠকের ভূমিকা পালন করে। আন্দোলন সংগঠনে যুব সমাজকে তারা উদ্বুদ্ধ করে। ব্লগ ও ফেসবুকে সংস্কারের পক্ষে জনমত তৈরী করে। কিন্তু তাদের নেতাদের আন্দোলনের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল মার্কিনীরা, যা উইকিলিকস ফাঁস করেছে। সাম্রাজ্যবাদী সাহায্যপুষ্ট ট্রেডইউনিয়নগুলোও এ আন্দোলনে যোগ দেয়। সরকারের প্রতিহিংসা থেকে সিএসও-এনজিওদের তৎপরতাকে অব্যহত রাখার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির দায়িত্ব বর্তায় সাম্রাজ্যবাদী দুতাবাসগুলোর উপর। এভাবে সা¤্রাজ্যবাদ তার কাঙ্খিত রাজনৈতিক সংস্কার সাধনে স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগায়। এবং প্রকৃত মুক্তির পথ হিসাবে বিপ্লবী পথ থেকে জনগণকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা চালায়। সুতরাং আরব সংস্কারের ঘটনা আমাদের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে কিভাবে তরুণ সমাজ, ট্রেডইউনিয়ন, ইসলামী হতে শুরু করে বাম রঙবেরঙের রাজনৈতিক দল, সিএসও-এনজিও, গণমাধ্যম, সামাজিক আন্দোলন ইত্যাদি শক্তিকে সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় সামিল করে এবং তাদের কাজের ধারাই বা কি হয়। সুতরাং হিলারি ক্লিন্টন যখন ড. ইউনুস এবং ফজলে আবেদের সাথে সাক্ষাত করেন, তরুণ নেতৃত্বের সাথে আড্ডা দেন, সুশীল সমাজের তৎপরতা অব্যহত রাখা, ট্রেডইউনিয়ন নেতার মৃত্যুতে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেন-তার মর্মার্থ আমরা উপলব্ধি করতে পারি। গত

[ ২৩ জুন ২০১২ জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ আয়োজিত আলোচনা সভায় আলোচকদের বক্তব্যের সম্পাদিত নোট  ]

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন