সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণীগত ঐক্য ও সংগ্রাম জোরদার কর!

দুনিয়ার মজদুর, নিপীড়িত জাতি ও জনগণ- এক হও!

সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণীগত ঐক্য ও সংগ্রাম জোরদার কর!

শিল্পাঞ্চলে চলো, স্ফুলিঙ্গ জ্বালো, গণশক্তির উত্থান ঘটাও!

মহান মে দিবস উদযাপন কর!

শ্রমজীবী বন্ধুগণ ও নিপীড়িত জনতা,

১৮৮৬ সালে ৮ ঘন্টা শ্রম-৮ ঘন্টা বিশ্রাম- ৮ ঘন্টা বিনোদনসহ মানুষের মত বাঁচার উপযোগী মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকরা। ১ লা মে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সমাবেশে মালিকের মদদে পুলিশ গুলি চালায়। অনেকে শহীদ হন। মিথ্যা মামলায় ফাঁসিতে ঝোলানো হয় আন্দোলনের নেতাদের। কিন্তু সে আন্দোলন শিকাগো শহর, আমেরিকা ছাড়িয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। সরকারগুলো এ দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। তাই দিনটিকে পুঁজিবাদী শ্রমদাসত্ব থেকে মুক্তির লড়াইয়ে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের একতা ও সংগ্রামের প্রেরণার দিন হিসাবে শ্রমিক শ্রেণী পালন করে আসছে।

পুঁজিবাদ তার সর্বোচ্চ স্তর সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়েছে। এতে কেবল পুঁজির শ্রম শোষণের তীব্রতাই বাড়েনি, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দালাল পুঁজির মালিক ফ্যাসিস্ট শাসকদের ক্ষমতায় বসিয়ে নয়া উপনিবেশ কায়েম করেছে। তারা উপনিবেশিক বাজার দখলের জন্য ও বিপ্লবী গণপ্রতিরোধের বিরুদ্ধে ক্রমাগত জন্ম দিচ্ছে যুদ্ধ ও সংঘাত। তারই প্রকাশ দেখা যাচ্ছে, প্যালেস্টাইনের গণহত্যা, ইউক্রেন, ইয়েমেন, মাইয়ানমার, ভারত, ফিলিপাইন, তুরস্কের যুদ্ধে।

বাংলাদেশেও সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় পুঁজির দালাল ফ্যাসিস্টদের রাজত্ব চলছে। তাই, আজ ১৪০ বছর পরও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ৮ ঘন্টা শ্রম-৮ ঘন্টা বিশ্রাম- ৮ ঘন্টা বিনোদনসহ মানুষের মত বাঁচার উপযোগী মজুরির আইনের প্রতি বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যাচ্ছে- বাংলাদেশের মালিক শ্রেণী ও সরকার।

বন্ধুগণ, আন্তর্জাতিক আইনে ৮ ঘন্টা কাজে একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি হতে হবে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার জন্য একটি শ্রমিক পরিবারের মোট খরচের সমান। সে হিসাবে আজ সর্বনিম্ন মজুরি বা আয় হওয়া উচিত অন্তত ৩৬ হাজার টাকা। অথচ তার ১/৩ ভাগ মজুরিও শ্রমিকরা পায় না। বিশ্বে সবচেয়ে কম বেতন ও মজুরি দেয়া হয় বাংলাদেশে। কেবল শ্রমিক নয়, সব ধরনের শ্রমজীবী, কর্মচারীদের অবস্থা একই। পরিবারের একাধিক সদস্য মিলে কাজ করেও, অতিরিক্ত সময় খেটেও সংসারের প্রয়োজন মিটছে না। ফলে দিনদিন কিস্তির বোঝা বাড়ছেই।

আমাদের চরমভাবে শুষে নিয়ে তৈরী হয়েছে মুষ্টিমেয় অতিধনী শ্রেণী। একদিকে ভারত, আমেরিকার স্বার্থে তারা আমদানী-রফতানিমুখী এক পণ্যের অর্থনীতি তৈরী করেছে। স্বনির্ভর জাতীয় শিল্প ও কৃষিসহ জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছে। তদুপরি, তারা তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, প্রজেক্ট-মেগাপ্রজেক্ট, ব্যাংক, শেয়ারবাজার লুটপাট করেছে। তাদেরই স্বার্থে সরকার মেগা দুর্নীতির মেগাপ্রজেক্ট করেছে। সেসব খরচ জোগাতে দেশি-বিদেশি ঋণ আর করের বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপিয়েছে। সরকার তাদের শূণ্য সুদে ঋণ, কোটি কোটি টাকা প্রণোদনা, কর ছাড়, ভর্তুকি আর অবাধ লুটের আইনী সুরক্ষা দিয়েছে। তবু তারা কর ফাঁকি, বিল বকেয়া, ঋণখেলাপী করেছে। সব ধরণের পণ্যে সিন্ডিকেট করে অতিমুনাফা লুটে চলেছে। সে অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। রিজার্ভ সংকট ডেকে এনেছে। এভাবে আজ জাতীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত করে ফেলেছে।

এখন জনগণের একদিকে আগের মত ইনকাম নাই। বেকারত্বও বাড়ছে। তারওপর দ্রব্যমূল্য, কিস্তি, করের বোঝা জীবন পিষে যাচ্ছে। চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ।

স্বাভাবিকভাবে এই অবাধ শোষণ-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জন্ম নিয়েছে। এ প্রতিবাদ অঙ্কুরে নির্মূল করার জন্যই শোষক-লুটেরা দস্যুরা দেশে এক সন্ত্রাসী শাসন কায়েম করেছে। তারা দমনমূলক আইন, হামলা-মামলা, গুম-খুন করে জনগণের প্রতিবাদ, সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ধ্বংস করেছে এবং করে চলেছে। সুতরাং এই অতিধনী শ্রেণীর শোষণ-লুণ্ঠনের সাথে শাসক দলের দমন-পীড়নের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

আজ প্রমাণিত হয়েছে যে, সাম্রাজ্যবাদের আনুকূল্যকামী অতিধনী শ্রেণীর ক্ষমতাবহির্ভূত দলের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন থেকে জনগণকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। আজকের দুনিয়ায় কেবল শ্রমিক শ্রেণীই সেই বাস্তব রাজনৈতিক শক্তি যার এই সক্ষমতা রয়েছে। অসংগঠিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে কেবল শ্রমিকরাই তাদের লড়াইয়ের সক্ষমতা প্রদর্শন করে চলেছে। এই শ্রমিক আন্দোলনের সাথে ফ্যাসিবাদবিরোধী বিপ্লবী সংগ্রামকে মিলিত করা এবং স্ফুলিঙ্গ তথা উল্লম্ফনের আকারে তাকে এগিয়ে নেয়ার মধ্যেই আছে বিপ্লবী গণশক্তির উত্থানের সুনিশ্চিত সম্ভাবনা।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা শ্রমিক, শ্রমজীবী, কৃষক, কর্মচারী, হকারসহ নিন্ম আয়ের জনগণের জীবন বাঁচাতে নিম্নোক্ত দাবি ও আহ্বান উত্থাপন করছি।

আসুন, মে দিবসের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে এ দাবি আদায়ে সংগঠিত হই, সংগ্রাম জোরদার করি। স্ফুলিঙ্গ জ্বালাই, গণশক্তির উত্থান ঘটাই। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করে জনগণের রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এগিয়ে নিই। ফিলিস্তিনসহ সারা দুনিয়ার সর্বহারা, নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সাথে একযোগে মুক্তির লড়াই শাণিত করি।

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন