আমরা জানি, ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল হাইজ্যাক করে; মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের আজ্ঞাবাহী এক-এগারোর তৃতীয় শক্তির নেতৃত্বে ড. ইউনুসের ইন্টারিম সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে; এই কমিশনের একটা বড় ভূমিকা আছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মি. ফালকার টুর্ক বিবিসিকে বলছিলেন, “আমরা প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনীকে সতর্ক করি, যদি তারা এতে জড়িত হয়, তার অর্থ দাঁড়াবে তারা হয়ত আর শান্তিরক্ষী পাঠানোর দেশ থাকতে পারবে না। ফলশ্রুতিতে আমরা পরিবর্তন দেখলাম”।
কমিশনের রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘‘যা বিক্ষোভ চলাকালে… বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে সেনা কর্মকর্তাদের অনাগ্রহী করে তোলে।”
সুতরাং বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, এই কার্যালয় সরকারের দিক থেকে একটি প্রতিদান।
বস্তুত এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে প্রচ্ছন্নভাবে মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
বাংলাদেশের মত নয়া উপনিবেশিক রাষ্ট্রে শাসকদের মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন একটা সাধারণ ঘটনা। কিন্তু মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদের ঘনিষ্ঠমিত্রদের বিষয়ে কমিশনকে চোখ বুজে থাকতে দেখবেন। অথচ অর্থনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে যেখানেই কোন শাসকের হাত মোচড়ানো বা রেজিম পরিবর্তন দরকার, সেখানে কমিশন খুব তৎপর হয়। মিশনের রিপোর্টকে অজুহাত করে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ নানা ধরণের অবরোধ বা অবরোধের হুমকি দিয়ে তাদের তেতো বড়ি গিলতে বাধ্য করে। সহজ কথায়, দেশীয় শাসকদের নিয়ন্ত্রণে মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম হাতিয়ার হল জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন।
১৬টি সংঘাতপূর্ণ দেশ ছাড়া বিনাদপ্তরেই এই কমিশন সারা বিশ্বে সক্রিয় আছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই এমন দপ্তর স্থাপন করা হল। বাংলাদেশ বর্তমানে কোন সংঘাতপূর্ণ এলাকা না হলেও এখানে এই দপ্তর স্থাপনের কারণ কি?
যদিও এর ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে “বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনগুলোকে প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের বাংলাদেশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তার মানবাধিকার সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণে সহায়তা করা।” তার মানে এটি ১/১১-এর “সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র সংস্কার এজেণ্ডা” বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা। যার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও শাসক শ্রেণীর ওপর মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদের নয়া উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ আরো গভীর ও বিস্তৃত হবে।
কিন্তু এই জাতীয় প্রেক্ষিত থেকে জমকের ১৭ তম দপ্তর প্রতিষ্ঠার তাৎপর্য বুঝা যাবে না। এজন্য ভূ-রাজনৈতিক বিশেষত মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি প্রেক্ষাপটে একে স্থাপন করতে হবে।
আমরা জানি, মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এই নাজুক অবস্থা থেকে একে পুনরুদ্ধারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী চীন-রুশ সাম্রাজ্যবাদকে কনটেইন করা ছাড়া তাদের সামনে কোন পথ খোলা নেই । তাই চীন ঘেরাওকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ চীন সাগরসহ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আধিপত্য হয়ে উঠেছে বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক, সামরিক লড়াইয়ের প্রধান ক্ষেত্র। চীনের ব্যবসা ঠেকানো, উৎপাদনখাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার নীতি, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, কোয়াড প্রতিষ্ঠা, বার্মা এক্ট, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রেটেজির আওতায় নানা চুক্তির বলে অত্র অঞ্চলের দেশগুলোকে বেঁধে ফেলা, এ জন্য ট্রাম্পের “শুল্ক অস্ত্র” ব্যবহার ইত্যাদি এই অঞ্চলে বড় ধরনের আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ প্রস্তুতিরই প্রকাশ।
বর্তমান মার্কিন তাঁবেদার ইন্টারিম সরকারকে অকারণে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। এক-এগারোর রাষ্ট্র সংস্কার এজেন্ডাসহ এই সরকার ইতিমধ্যেই আরাকান করিডোর, মার্কিন সামরিক যন্ত্রের সাথে যুক্ত কোম্পানির হাতে ইন্টারনেট, বন্দর, অস্ত্রকারখানা তুলে দিয়েছে ও দেয়ার চেষ্টা করেছে। প্রথমবারের মত মার্কিনীদের সাথে নন-ডিসক্লোজার চুক্তি করেছে। ট্রাম্পের শুল্ক আগ্রাসনকে অজুহাত করে মার্কিনীদের সাথে দাসত্বমূলক চুক্তি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যা এই বৈশ্বিক দ্বন্দ্বের অন্তর্গত। মানবাধিকার কমিশনের আবাসিক দপ্তরের অনুমোদন এই সমগ্র যন্ত্রের কলকব্জা বিশেষ। এর মাধ্যমে মূলত আসন্ন ভূ-রাজনৈতিক-সামরিক সংঘাতে ইন্টারিম-পরবর্তী সরকার ও রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলা হল।
– চলমান আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ প্রস্তুতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান!
– আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে বাংলাদেশকে জড়াবার লক্ষ্যে চলমান সমস্ত চুক্তি, প্রকল্প ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন!
– মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের দালালদের ক্ষমতাচ্যুত করুন! ভারত ও চীন-রাশিয়ার দালালদের উন্মোচন করুন!
– সাম্রজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তির রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলুন!
– সকল দেশের সর্বহারা, নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ হোন!

