শেখ হাসিনার ভারত সফরের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ওপর ভারতের সম্প্রসারণবাদী আধা-উপনিবেশিক একাধিপত্য কায়েমের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো!

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বাংলাদেশের জাতি ও জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বৈদেশিক শত্রু হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে!

মসনদ টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে ভারতের কাছে দেশবন্ধক দেয়া আওয়ামী ফ্যাসিবাদ আজ প্রায় পুতুল সরকারে পরিণত হয়েছে!

সম্প্রসাণবাদী ভারতের স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য হলো ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠা। এই লক্ষ্য অর্জনের অপরিহার্য শর্ত হলো আঞ্চলিক রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদীয়মান সাম্রাজ্যবাদী চীনের ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ সর্বাত্মকভাবে খর্ব করে নিজের দখল কায়েম করা। শেখ হাসিনার সফর ও চুক্তি-সমঝোতার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের সেই জাতীয় লক্ষ্য ও ভু-রাজনৈতিক রণনীতির পশ্চাদভূমি পরিণত করা হলো।

আঞ্চলিক শক্তি ও উন্নত দেশ হয়ে ওঠার লক্ষ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের নিজের স্ট্র্যাটেজির প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হলো ”ইন্দো-প্যাসিফিক ওসেন ইনিশিয়েটিভ”। বাংলাদেশ এই সংস্থায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাকে সফরকালে স্বাগত জানিয়েছে মোদী। অর্থাৎ এক্ষেত্রে চীন ও মার্কিন উদ্যোগগুলো থেকে দূরে রেখে বাংলাদেশকে এককভাবে ভারতের স্ট্র্যাটেজির অনুসারিতে পরিণত করা হয়েছে।

ভারতের জাতীয় ভিশন ও স্ট্র্যাটিজি অর্জনের জন্য কেবল প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নয়, আঞ্চলিক সমুদ্র নিরাপত্তা, সমুদ্র অর্থনীতি, মহাকাশ, ডিজিটাল ও টেলিকমিউনিকেশনের ক্ষেত্রগুলোতেও চীনকে ঠেকিয়ে ভারতের দখল কায়েম জরুরী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, চীনের সাথে বাংলাদেশের ২০১৫ সালে করা চুক্তিগুলোর আওতায় এসব ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার পেতে চীনও চাপ সৃষ্টি করছে। তাই উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে এখনই নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকলেও, শেখ হাসিনার আসন্ন চীন সফরের আগে রূপরেখামূলক চুক্তি করে ভারতের হিস্যা ও চীনের প্রবেশের সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়া হলো। এভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাগুলোর ওপরও ভারতের দখল সম্প্রসারিত হলো।

ভারতের রণনীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো এ অঞ্চলে এবং বিশেষত বাংলাদেশে উদীয়মান সাম্রাজ্যবাদী চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকে রোধ ও খর্ব করা, যাতে বাংলাদেশকে একাধিপত্যমূলক পশ্চাদভূমিতে পরিণত করা যায়। ফলে সমুদ্র নিরাপত্তা, সমুদ্র অর্থনীতি, মহাকাশের মত সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোতেই নয়, ইতিমধ্যে যেসব ক্ষেত্রে চীন প্রবেশ করেছে, সেখানে ভারত পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

ভারত সীমান্তে চীনের উপস্থিতি চায় না বলেই তিস্তা প্রকল্পে চীনের ১০০ কোটি ডলারের প্রস্তাবে হাসিনাকে সায় দিতে দেয় নি। এর আগে চীনে সফররত হাসিনাকে ভারত সোনাদিয়া সামুদ্রিক বন্দর করার বিষয়ে চুক্তি করা থেকে বিরত করে এবং ভারত নিজের সুবিধামত পায়রা সামুদ্রিক বন্দর প্রকল্প করতে বাধ্য করে। তিস্তার পানি বণ্টনের দীর্ঘদিনের দাবি সম্পর্কে কোন টু শব্দ না করলেও, এবার বাংলাদেশ অংশে তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগ ও নদী ব্যবস্থাপনা চুক্তি করেছে।

এছাড়া এবার মোংলা বন্দর উন্নয়নে চীনের টাকা নেয়ার প্রেক্ষিতে সেখানে একটা টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। ডলারের পরিবর্তে ইয়েন-টাকায় লেনদেনের সুবিধার মত রুপী-টাকায় লেনদেনের সুবিধা দেবে ভারত।

চীন বরাবরই বাংলাদেশে অস্ত্রের প্রধান বিক্রেতা। ভৌগোলিকভাবে তিনদিক সীমান্তে ঘেরা ভারতই বাংলাদেশের স্বাভাবিক ও প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হওয়ায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্ট্র্যাটিজিকালি অস্ত্রের যোগানের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর নির্ভর করতে কখনো চায় নি। কিন্তু বর্তমান ও বিগত সফরকালে সামরিক ক্ষেত্রে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের মত বিষয়গুলোতে ভারতের কব্জা ক্রমশ দৃঢ়তর করা হচ্ছে। ফলে ভারতের প্রশ্নে সামরিক বাহিনী স্ট্র্যাটেজিকালি পঙ্গু হয়ে যাবে। বিডিআরকেতো আগেই ভারতের ইচ্ছায় পুনর্গঠন করা হয়েছে। এখন ফ্যাসিস্ট মাসনের অন্যতম স্তম্ভ পুলিশ বাহিনীর শিক্ষা-প্রশিক্ষণেও তা সম্প্রসারিত হলো। ফলে বাংলাদেশকে করায়ত্ত্ব করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আপাত সামরিক স্বাতন্ত্র্যের যে জায়গাটুকু ছিল, সেই বাধাও থাকলো না।

আর ভারতের নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন সাপেক্ষে অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণের প্রশ্নে এই সফরতো এক মাইল ফলক হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে!

২০০৪ সালে হাসিনা-মনমোহন চুক্তিতে কানেকটিভিটির দশক ঘোষণা করা হয়েছিল। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে অন্যতম প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য এই সড়ক, রেল, আকাশ, বিদ্যুৎ, জ্বালানী, বন্দর, টেলিকমিউনিকেশন, ডিজিটাল কানেকটিভিটি তৈরী করা ছিল এই স্ট্র্যাটেজির লক্ষ্য। তার আওতায় ট্রান্স এশীয় রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার অংশহিসাবে পদ্মাসেতু, রেলযোগাযোগসহ নতুন অবকাঠামো তৈরী করা হয়েছিল। বার্মা, চীন, মালয়েশিয়া পর্যন্ত পূর্বদিকে তার বিস্তার লাভের কথা। কিন্তু সেদিকে তা অগ্রসর হয় নি। পরিবর্তিত ভূ-রাজনেতিক বাস্তবতায় সমস্ত ”কানেকটিভিটি” প্রকল্প এখন ভারতের ১৯৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উত্তরণের ভিশন তথা বৃহৎ পুঁজির সম্প্রসারণবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উপায়ে পরিণত হয়েছে ।

এইসব কানেকটিভিটি প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ভারতের স্বাধীনতাকামী পূর্বাঞ্চলসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক, রাজনেতিক ও সামরিকভাবে কেন্দ্রিভূত ও সংহত করে তুলছে। ইতিমধ্যে নৌ ও সড়ক করিডোর নেয়ার পর এবার প্রায় ১০টি স্থানে সংযোগসহ দেশের মধ্যদিয়ে রেল ট্রান্সিট ও করিডোর হাসিল করেছে। এই কানেকটিভিটির অংশ হিসাবেই সিরাজগঞ্জে কনটেইনার ডিপো নির্মাণের প্রস্তাব করেছে। কিছুদিনের মধ্যে খাগড়াছড়ি সীমান্তের ভারতের সাথে সংযোগ সেতুর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। সাধারণত কোন দেশের অভ্যন্তরে অপর রাষ্ট্রের এ ধরণের স্বার্থ থাকলে, তাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনা করা হয়।

এভাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামরিক, ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনেতিকভাবে আরো বেশি করে এককভাবে ভারতের করতলগত হয়ে পড়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের ওপর ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের ফলে। আর এই আধিপত্য কায়েম সম্ভব হয়েছে চরম জনঘৃণিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ক্ষমতায় থাকার বিনিময়ে দেশবিক্রির জাতীয় বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরি নীতির কারণে।

সংক্ষেপে বললে, শেখ হাসিনার ভারত সফরের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ওপর ভারতের সম্প্রসারণবাদী আধা-উপনিবেশিক একাধিপত্য কায়েমের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো! ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বাংলাদেশের জাতি ও জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বৈদেশিক শত্রু হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে! মসনদ টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে ভারতের কাছে দেশবন্ধক দেয়া আওয়ামী ফ্যাসিবাদ আজ প্রায় পুতুল সরকারে পরিণত হয়েছে!

তাই ভারতের সম্প্রসারণবাদী উপনিবেশবাদ থেকে জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার করতে চাইলে ভারতের তাঁবেদার দেশবেচা আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের লড়াই বেগবান করুন!

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন