(মাওবাদ কী? তা নিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে গভীর আগ্রহ রয়েছে। পেরুর কমিউনিস্ট পার্টিই সর্বহারার আন্তর্জাতিক মতাদর্শকে প্রথম ”মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ” হিসাবে সূত্রায়ন করেছিলেন। পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ১৯৮৮ সালে মৌলিক দলিলসমূহ প্রকাশ করে। এর তিনটি অংশ রয়েছে- ক. মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ সম্পর্কে, খ. গনসালো চিন্তাধারা বিষয়ে এবং গ. কর্মসূচি ও গঠনতন্ত্র। ‘অনুবাদ সাহিত্য পত্র’-এ প্রকাশিত বাংলা অনুবাদিটির সাহায্য নিয়ে এ অনুবাদটি করা হয়েছে। মাওবাদ কী তা নিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে গভীর আগ্রহ রয়েছে। তাই সভাপতি মাওসেতুঙ-এর ৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ প্রথম অংশটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হল।)
মৌলিক দলিলসমূহ
কেন্দ্রীয় কমিটি
পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি
১৯৮৮
ক। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ সম্পর্কে
শ্রেণীসংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষায় আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শ মার্কসবাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, যা পরে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এবং পরবর্তীতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ-এ বিকশিত হয়। সুতরাং, এই সর্বহারার বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ; যা সত্য বিধায় সর্বশক্তিমান; তার দ্বান্দ্বিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় রয়েছে তিনটি স্তর: ১। মার্কসবাদ ২। লেনিনবাদ ৩। মাওবাদ, এই তিনটি স্তর, ক্ষণ বা মাইলফলক হচেছ একই ঐক্যের তিনটি অংশ যার শুরু হয়েছিল একশ চল্লিশ বছর আগে কমিউনিস্ট ইশতেহার দিয়ে; বীরত্ত্বপূর্ণ মহাকাব্যিক শ্রেণী সংগ্রামসহ কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যকার প্রচণ্ড ও ফলপ্রসু দুইলাইনের সংগ্রাম এবং পর্বত-প্রমাণ চিন্তা ও কাজসমূহ যা কেবল সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষেই সৃষ্টি করা সম্ভব- তার মধ্যদিয়ে বিরাট উল্লম্ফনে এর অসমান্য অগ্রগতি ঘটিয়েছেন, সে তিন চিরঅম্লান উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক: মার্কস, লেনিন ও মাওসেতুঙ, যে তিন মহান ব্যক্তি আমাদের অপরাজেয় মতাদর্শ মার্কসবাদ- লেলিনবাদ-মাওবাদ দিয়ে সজ্জিত করেছেন, যা আজ হচ্ছে প্রধানত মাওবাদ।
যদিও মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তার সার্বজনীন প্রযোজ্যতার স্বীকৃতি অর্জন করেছে, মাওবাদ এখনও তৃতীয় স্তর হিসেবে সম্পূর্ণ স্বীকৃত হয়নি। কেউ স্রেফ এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন, আবার অন্যরা কেবল “মাওসেতুঙ চিন্তাধারা” হিসেবে একে গ্রহণ করেন। সারবস্তুতে, উভয় মতাবস্থানই, তাদের মধ্যে অনিবার্য পার্থক্য সত্ত্বেও মার্কসবাদের সাধারণ বিকাশের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান মাওয়ের অবদানকে অস্বীকার করে। মাওবাদের “বাদ” চরিত্রের অস্বীকৃতি এর সার্বজনীন প্রযোজ্যতাকে এবং কাজে কাজেই আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শের তৃতীয়, নতুন ও উচ্চতর স্তর হিসেবে এর বাস্তবতাকে অর্থাৎ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ, প্রধানত মাওবাদকে অস্বীকার করে, যাকে আমরা ঊর্ধ্বে তুলে ধরি, রক্ষা ও প্রয়োগ করি।
ভূমিকাস্বরূপ, মাওবাদ ও মাওবাদের জন্য সংগ্রাম করার প্রয়োজনীয়তাকে আরো ভালভাবে বুঝতে, আসুন আমরা লেনিনকে স্মরণ করি। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন যে বিপ্লব পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে তা বিশেষ অবস্থাগুলো প্রকাশ করেছিল, যদিও সেগুলো মূল নীতি বা নিয়মবিধিগুলোকে বাতিল করেনি- তা ছিল এমন এক নতুন পরিস্থিতি- বিপ্লবকে পরাজয়ের বিপদে ফেলার ঝুঁকিতে রেখে মার্কসবাদ যা উপেক্ষা করতে পারেনা। সংশোধনবাদী, সুবিধাবাদী ও দলত্যাগীদের “ভাবাদর্শ, শ্রেণী ও জনগণকে রক্ষা”-র ভীত ও প্রতারণাপূর্ণ দাবী অথবা পঁচা বুর্জোয়া মতাদর্শ দ্বারা নৈতিকভাবে স্খলিত পুরোনো ধারার নৃশংস শিক্ষাবিদ আর হলুদ সাংবাদিকরা যারা অন্ধভাবে পুরোনো সমাজকে রক্ষা করে, যেখানে তারা পরজীবী গোষ্ঠী; মার্কসবাদের বিরুদ্ধে তাদের ক্রোধোন্মত্ত আক্রমণের মুখে এবং উদারতাবাদ ও মিথ্যা মার্কসবাদ সর্বস্ব পণ্ডিত এবং বইপুজারী বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা নতুন কী তা নিয়ে হৈ চৈ করা সত্ত্বেও, একমাত্র ন্যায্য ও সঠিক কাজটি হ’ল মূর্ত অবস্থায় এবং প্রতিটি বিপ্লব অনিবার্যভাবে যে নতুন পরিস্থিতি ও সমস্যাগুলির মুখোমুখি হয়, তার সমাধানে মার্কসবাদ প্রয়োগ করা। লেনিন পরিস্কারভাবে আরো বলেছেন যে, কেবল বহুলচর্চিত পথের পূজারী যারা নতুন কিছু দেখতে অসমর্থ, পূবের বিপ্লব তাদের জন্য নতুন ও মহাচমক থেকে আরো বিষ্ময়কর কিছু উপহার দেবে; আর আমরা সবাই যা জানি, যেসব সমস্যা সমাধানে মাকর্সবাদ তখনও সক্ষম হয়নি, তার সমাধানে তিনি প্রাচ্যের কমরেডদের উপর আস্থা রেখেছিলেন।
অধিকন্তু, আমাদের অবশ্যই ভালোভাবে মনে রাখা উচিৎ যে, কমরেড স্ট্যালিন যখন ন্যায্যত ও সঠিকভাবে বলছিলেন যে আমরা মার্কসবাদের বিকাশ হিসেবে লেনিনবাদের স্তরে প্রবেশ করেছি, তখনও মার্কসবাদের কথিত রক্ষার আলখেল্লাধারীদের তরফ থেকে বিরোধিতা এসেছিল। সেখানে সেসব লোকেরাও ছিল, যারা বলেছিল যে লেনিনবাদ শুধু পশ্চাদপদ দেশগুলোতে প্রযোজ্য। কিন্তু সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অনুশীলন লেনিনবাদকে এক মহান বিকাশ হিসেবে মর্যাদার আসনে আসীন করে আর এভাবে সর্বহারার মতাদর্শ বিশ্বের সামনে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হিসেবে বিজয়ীরূপে প্রতিভাত হয়েছিল।
আজ মাওবাদ একইরকম পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। মার্কসবাদের মতো সব নতুন জিনিসই সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যায় এবং একইভাবে মাওবাদও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে ও স্বীকৃত হবে।
যে প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চেয়ারম্যান মাওসেতুঙ বিকশিত হয়েছিলেন আর মাওবাদ আকৃতি লাভ করেছিল, তার ভিত্তি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্বযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সর্বহারা আন্দোলন, জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদের মধ্যে সংগ্রাম এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়নে পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বর্তমান শতাব্দীতে লক্ষণীয় ঐতিহাসিক তিন বড় মাইলফলক: প্রথমত ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব যা বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবের যুগের দরজা খুলে দিয়েছে, দ্বিতীয়ত, ১৯৪৯ সালে চীন বিপ্লবের বিজয় যা সমাজতন্ত্রের পক্ষে শক্তিগুলোর পরস্পর-সম্পর্কে পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং তৃতীয়ত, মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব যা কমিউনিজমের দিকে বিপ্লবের অগ্রযাত্রা বজায় রাখার স্বার্থে সর্বহারা একনায়কত্বাধীনে অব্যাহত বিপ্লব হিসাবে ১৯৬৬ সালে শুরু হয়েছিল। এটি উল্লেখ করার মতো যথেষ্ট যে, চেয়ারম্যান মাও এসব গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক কীর্তির দুটোর নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বিশ্ববিপ্লবের কেন্দ্র হিসেবে চীনে মাওবাদ অভিব্যক্ত হয়েছিল দ্বন্দ্বসমূহ এবং তীব্র ও নির্মম শ্রেণী সংগ্রামের জটিলতম কেন্দ্রীভবনের মধ্যে, যা চিহ্নিত হয়েছিল মাঞ্চুরিয়া সাম্রাজ্যের পতনের পর (১৯১৯) সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর চীনকে ছিন্ন ও বিভক্তকরণের প্রবনতা, ১৯১৯ সালের সাম্রজ্যাবাদ বিরোধী আন্দোলন, মহান কৃষক জনতার বিদ্রোহসমূহ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বাইশ বছরের সশস্ত্র সংগ্রাম, সমাজতন্ত্র গড়ে তোলা ও বিকাশের বিরাট প্রয়াস এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব এগিয়ে নেয়ার জন্য দশটি ঝড়ো বছর, সেই সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরস্থ তীক্ষ্ণতম দুইলাইনের সংগ্রাম, বিশেষত সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম দ্বারা। এর সবই উপরোল্লেখিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কাঠামোর মধ্যে ঘটেছিল। এই সামগ্রিক ঐতিহাসিক কীর্তিগুলোর মধ্য থেকে আমাদের চারটিকে নির্দিষ্টভাবে পৃথক করতে হবে যাদের অসামান্য গুরুত্ব রয়েছে: ১৯২১ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)র প্রতিষ্ঠা, ১৯২৭ সালের শরৎকালীন ফসল কাটার অভ্যুত্থান, যা গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও- পথের সূচনা করেছিল, ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ঘটা মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব (জিপিসিআর), এসব কিছুতেই চেয়ারম্যান মাও ছিলেন মূখ্যচরিত্র এবং চীন বিপ্লবের স্বীকৃত নেতা।
চেয়ারম্যান মাওয়ের জীবনী হতে আমরা বলতে পারি যে, ১৮৯৩ সালের ২৬ শে ডিসেম্বর তিনি জন্ম নিয়ে যুদ্ধের শিখায় ঝলসিত এক বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে প্রথম চোখ মেলেছিলেন; ছিলেন কৃষকের সন্তান, বকসার বিদ্রোহ যখন শুরু হয় তার বয়স ছিল সাত; ছিলেন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের একজন ছাত্র, যখন তার আঠারো বছর বয়সে সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল এবং তিনি নিজেকে সৈন্যদলে তালিকাভূক্ত করেছিলেন, পরবর্তীতে নিজ প্রদেশ হুনানের কৃষক ও তরুণদের একজন দুর্দান্ত সংগঠক হয়ে উঠেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি আর শ্রমিক ও কৃষকদের লাল ফৌজের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে তিনি তিনি সর্বহারা শ্রেণীর সামরিক তত্ত্ব হিসাবে গণযুদ্ধকে বিকশিত করে গ্রামা দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের পথ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ছিলেন নয়া গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক এবং গণপ্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা; মহান সম্মুখবর্তী উলম্ফন (গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড) ও সমাজতান্ত্রিক বিকাশের একজন প্রবক্তা, ক্রুশ্চেভ ও তার ভৃত্যদের সমকালীন সংশোধনবাদবিরোধী সংগ্রামের নেতা, মহান সর্বহারা সংস্কৃতিক বিপ্লবের নেতা ও কর্ণধার। এসব হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে এবং একান্তভাবে বিপ্লবে উত্সর্গীকৃত জীবনের গৌরবময় চিহ্ন। এই শতাব্দিতে সর্বহারা শ্রেণী তিনটি মহান বিজয় প্রত্যক্ষ করেছে- যার দুটোতে চেয়াম্যান মাও নেতৃত্ব দিয়েছেন আর একটি যদি যথেষ্ট গৌরবজনক হয়, দুটো হচ্ছে তারও বেশী।
মাওবাদের বিষয়বস্তু, এর সারবস্তু সম্পর্কে আমাদের অবশ্যেই নিচের তিনটি মৌলিক ব্যাপার উপস্থাপন করতে হবে:
১। তত্ত্ব: মার্কসবাদের তিনটি অংশ রয়েছে: মার্কসবাদী দর্শন, মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতি, এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই তিনটি অঙ্গের সব কয়টির বিকাশ সার্বিকভাবে মার্কসবাদের এক বিরাট গুণগত উলম্ফনের জন্ম দেয়, যা উচচতর পর্যায়ের এক ঐক্য হিসেবে এক নতুন স্তরকে বোঝায়। ফলত, এটা দেখানো জরুরী যে, চেয়াম্যান মাও, তত্ত্বে ও অনুশীলণে যেমন দেখা যায়, তেমন একটি বিরাট গুণগত উলম্ফনের সৃষ্টি করেছেন। আসুন পরবর্তী পয়েন্টগুলোর মাধ্যমে আমরা তা নজরে আনি:
মার্কসবাদী দর্শনে তিনি দ্বন্দ্বের নিয়ম (ল অব কন্ট্রাডিকশন)কে একমাত্র মৌলিক নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে দ্বন্দ্বতত্ত্ব (ডায়ালেকটিকস)-এর সারবস্তুর বিকাশ ঘটান; এবং এছাড়া রয়েছে জ্ঞান তত্ত্বের ক্ষেত্রে তাঁর গভীর দ্বান্দ্বিক উপলব্ধি যার কেন্দ্র হচেছ এর নিয়ম গঠনকারী দুই উলম্ফন (অনুশীলন থেকে জ্ঞান, আর তার বিপরীত, কিন্তু জ্ঞান থেকে অনুশীলন হচেছ প্রধান)। আমরা গুরুত্বারোপ করি যে, তিনি দ্বন্দ্বের নিয়মকে দক্ষতার সাথে রাজনীতিতে প্রয়োগ করেছেন এবং অধিকন্তু ব্যাপক জনগণের মধ্যে দর্শনকে নিয়ে গিয়ে মার্কসের রেখে যাওয়া কাজ সম্পন্ন করেছেন।
মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিতে, চেয়ারম্যান মাও ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর মধ্যকার সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করেন এবং “উৎপাদিকা শক্তি’’ সংক্রান্ত সংশোধনবাদী থিসিসের বিরুদ্ধে মার্কসবাদী- লেনিনবাদী সংগ্রামকে অব্যাহত রাখার মাধ্যমে উপসংহার টানেন যে উপরিকাঠামো, চেতনা ভিত্তিকে রূপান্তর করতে পারে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে উৎপাদিকা শক্তিকে বিকশিত করা যায়। রাজনীতি হচেছ অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ- এই লেনিনবাদী ধারণাকে বিকশিত করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন যে, রাজনীতিকে অবশ্যই কমান্ডে থাকতে হবে (সর্বস্তরে প্রযোজ্য) এবং রাজনৈতিক কাজ হচেছ অর্থনৈতিক কাজের প্রাণসূত্র যা স্রেফ এক অর্থনৈতিক পলিসি নয় বরং আমদের রাজনৈতিক অর্থনীতির সত্যিকার সমাধানে নিয়ে যায়।
বিশেষত যারা গণতান্ত্রিক বিপ্লব করছে তারা প্রায়ই গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও একটি ব্যাপারকে পাশে সরিয়ে রাখে, সেটা হচেছ আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ সংক্রান্ত মাওবাদী থিসিস, এটা হচ্ছে সেই পুঁজিবাদ যা সাম্রাজ্যবাদ নানা মাত্রার সামন্তবাদ অথবা এমনকি প্রাক-সামন্তবাদী স্তরসমূহের ভিত্তিতে নিপীড়িত দেশগুলিতে গড়ে তুলছে। এটি মূলত এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, যেহেতু একটি ভাল বিপ্লবী নেতৃত্ব এসংক্রান্ত উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত হয়, বিশেষতঃ যখন আমলাতান্ত্রিক পুঁজির বাজেয়াপ্তকরণ দ্বিতীয় স্তর হিসাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়ার অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রস্তুত করে।
কিন্তু প্রধান বিষয়টি হচেছ চেয়ারম্যান মাওসেতুঙ সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিকশিত করেছেন। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হল, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের উপর তাঁর সমালোচনা, পাশাপাশি কীভাবে চীনে সমাজতন্ত্র বিকাশ করা যায় সে সম্পর্কে তার থিসিস: কৃষিকে ভিত্তি আর শিল্পকে নেতৃত্বকারী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা, ভারী শিল্প, হালকা শিল্প ও কৃষির মধ্যকার সম্পর্ক দ্বারা পরিচালিত শিল্পায়ন, ভারী শিল্পকে অর্থনৈতিক নির্মাণের কেন্দ্র হিসেবে নিয়ে একই সাথে হালকা শিল্প ও কৃষির প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। মহান অগ্রগামী উলম্ফন এবং তা বাস্তবায়নের শর্তসমূহের প্রতি অবশ্যই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে: এক, যে রাজনৈতিক লাইন একে একটি ন্যায্য ও সঠিক কার্যধারা প্রদান করে; দুই, যথাক্রমে বেশি থেকে কম পরিমাণ ছোট, মাঝারী ও বড় সাংগঠনিক কাঠামো, তিন, এক অগ্রগামী উলম্ফন যার ফলাফলগুলো নতুন প্রক্রিয়াটি গতিপ্রাপ্তি এবং এর আশু অর্জনগুলোর চেয়ে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতের কারণে,এবং কৃষিযৌথকরণ ও গণকমিউনের সাথে এর সংযোগের জন্য অধিকতর মূল্যবান, তাকে চালু ও সফল তার দিকে চালিত করতে ব্যাপক জনগণের এক বিশাল প্রচেষ্টা, এক দুর্দান্ত কর্মশক্তি। অবশেষে, বিপ্লব ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে বিদ্যামান যে সম্পর্ক, সমাজতন্ত্রের সেই নিয়ম-বিধি বোঝা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তবিমুখীতা ও আত্মমুখীতা সংক্রান্ত তাঁর শিক্ষাগুলো বিবেচনা করুন, যেহেতু সমাজতন্ত্রের অল্প কয়েকটি দশক তার পুরো বিকাশকে দেখতে অনুমোদন করেনি, কাজেই এর নিয়ম ও তার বিশেষত্বের সেরা বোঝাপড়া, যা প্রধানত ‘‘বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরো ও উৎপাদন বাড়াও” এই শ্লোগানে মূর্ত হয়েছে। মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির এই বিকাশ তার অসীম গুরুত্ব সত্ত্বেও স্বল্প মনোযোগই পেয়েছে ।
বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে, চেয়ারম্যান মাও বিকশিত করেছিলেন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্তরে বিশ্লেষণ করে শ্রেণি বিষয়ক তত্ত্ব; ব্যতিক্রমহীন সার্বজনীন নিয়ম হিসেবে বিপ্লবী সহিংসতা, এক শ্রেণীর দ্বারা আরেক শ্রেনীর সহিংস প্রতিস্থাপন হিসেবে বিপ্লব;, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘‘বন্দুকের নল থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বেড়িয়ে আসে” এই মহান থিসিস, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের পথের সাধারণ নিয়মগুলো বিধিবদ্ধ করার মাধ্যমে নিপীড়িত দেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল প্রশ্নের সমাধান । তিনি প্রতিভাদীপ্তভাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণীসংগ্রামের তত্ত্বকে বিকশিত করার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেন যে এতে সর্বহারা ও বুর্জোয়ার মধ্যে, সমাজতান্ত্রিক পথ ও পুঁজিবাদী পথের মধ্যে এবং সমাজতন্ত্রও পুঁজিবাদের মধ্যে বৈরী সংগ্রাম চলে; এটা মূর্তভাবে নির্ধারিত হয়নি কে কাকে পরাজিত করবে, এমন একটি সমস্যা যার সমাধানের জন্য সময়ের প্রয়োজন; সর্বহারা শ্রেণী কর্তৃক সর্বহারা একনায়কত্বের মাধ্যমে নির্ধারকভাবে নিজেকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করতে পারার জন্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পাল্টা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটির উন্মোচন; এবং সর্বশেষে এবং প্রধানত সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কতন্ত্রের অধীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারাবাহিকতা হিসাবে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ মহৎ সমাধান।
সরল সহজভাবে বিবৃত কিন্তু জানা ও অনস্বীকার্য এই মূল প্রশ্নগুলি চেয়ারম্যান কর্তৃক মার্কসবাদের অবিচেছদ্য অংশগুলির বিকাশ এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের একটি নতুন, তৃতীয় ও উচচতর স্তর: মার্কসবাদ-লেনিনবাদ- মাওবাদ, প্রধানত মাওবাদে উন্নীত হওয়ার প্রমাণ দেখায়।
এই সংক্ষিপ্ত দূরদর্শী সংশ্লেষণ অব্যহত রেখেই আসুন আমরা অন্যান্য নির্দিষ্ট বিষয়গুলির দিকে তাকাই, সেগুলি উপর দিক থেকে উদ্ভূত হওয়া সত্ত্বেও অন্তত পৃথকভাবে বিবেচনার জন্য যথাযথ মনোযোগ ও গুরুত্ব লাভ করা উচিত।
২। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব
প্রথমত, তিন ধরণের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি রাষ্ট্র সংক্রান্ত মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশ: ১)মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বুর্জোয়া শ্রেণীর পুরোনো বুর্জোয়া গণতন্ত্রসমূহ, এমন এক প্রকার, নিপিড়ীত দেশগুলো যেমন ল্যাটিন আমেরিকার যে কোন দেশ যার অন্তর্ভূক্ত হতে পারে; ২) সংশোধনবাদীদের কর্তৃক ক্ষমতা দখলের পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা চীনের মত সর্বহারা একনায়কত্ব; এবং ৩) কৃষক শ্রমিক মৈত্রীর ভিত্তিতে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালনায় যৌথ একনায়কত্ব হিসেবে নয়া গণতন্ত্র, যা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কালে চীনে গঠিত হয়েছিল এবং পেরুতে আজ যা মূর্তভাবে প্রকাশিত হয় গণকমিটিগুলোর আকারে ঘাঁটি এলাকাসমূহে এবং উদীয়মান নয়া গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রে। রাষ্ট্র সংক্রান্ত তত্ত্বের বিকাশের মধ্যে মৌলিকভাবে জোর দিতে হবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলোর মধ্যকার মূল পার্থক্য রাজনৈতিক ক্ষমতাধারী শ্রেণী অথবা শ্রেণীসমূহের একনায়কত্বের মধ্যে, যা হল প্রধান, আর একটি সরকার ব্যবস্থা, যাকে রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চার এক সংগঠন হিসেবে বোঝা হয়।
অন্যদিকে চেয়াম্যান মাও-কৃত অন্যতম অসাধারন বিকাশ নয়াগণতন্ত্র, আমাদের জন্য মুন্সিয়ানার সাথে মূর্ত করে বুর্জোয়া বিপ্লবের এক নতুন ধরণ, যাতে কেবল সর্বহারা শ্রেণী নেতৃত্ব দিতে পারে। সংশেষণে, এটা হচেছ বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবের যুগে –গণতান্ত্রিক বিপ্লব, যে যুগে আমরা এগিয়ে চলেছি ।অতি অবশ্যই দুনিয়াকে রূপান্তর করার একমাত্র পথ সশস্ত্র উপায়ে পুরোনো ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ ও নতুনটিকে উর্ধ্বে তুলে ধরে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব এক নতুন অর্থনীতি, এক নতুন রাজনীতি ও এক নতুন সংস্কৃতির প্রয়োজন বোঝায়। শেষত, এটা জোর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ যে, নয়াগণতন্ত্র হচেছ একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লব। যদিও এটি প্রধানভাবে গণতান্ত্রিক কর্তব্যগুলি সম্পন্ন করবে, এটা গৌনভাবে কিছু সমাজতান্ত্রিক কাজে্ও অগ্রসর হয় যাতে আমাদের মতো দেশগুলির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ দুই স্তর বিশিষ্ট গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রশ্ন পরিপূর্ণভাবে সমাধা হতে পারে, এই নিশ্চয়তারভিত্তিতে যে একবার গণতান্ত্রিক বিপ্লব শেষ হবার পর কোন প্রকার বিরতি অথবা বিঘ্ন ছাড়াই এটা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হিসেবে অব্যাহত থাকবে ।
৩। তিন হাতিয়ার
বিপ্লবের হাতিয়ারসমূহ বিনির্মাণের সমস্যা পার্টির সামনে উত্থাপিত হয় পার্টি, বাহিনী ও যুক্তফ্রন্টের আন্তসম্পর্ককে আত্মস্থ করা; এবং যুদ্ধের মধ্যে অথবা সশস্ত্র জনগণের ক্ষমতার উপর গড়ে ওঠা নতুন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার মধ্যে তিন হাতিয়ারের আন্তসম্পর্কিত বিনির্মাণকে বোঝা ও সঠিকভাবে পরিচালনার সমস্যারূপে এভাবে প্রকাশ করে কর্তব্যের একটি যথাযথ ও সঠিক দিশা। এসবের বির্নিমাণ এই নীতিটির দিশায় পরিচালিত যে একটি ন্যায্য ও সঠিক মতার্দশিক লাইন সবকিছুর নির্ধারক, আর এই মতাদর্শিক-রাজনৈতিক ভিত্তির ওপর সাংগঠনিক বিনির্মাণ যুগপৎ বিকশিত হয় সর্বহারা লাইন ও বুর্জোয়া লইনের মধ্যকার সংগ্রাম এবং শ্রেণীসংগ্রামের ঝড়, সংগ্রাম প্রধান রূপ হিসাবে প্রধানত যুদ্ধের মধ্যদিয়ে, হোক তা চলমান অথবা সম্ভাব্য।
পার্টি সংক্রান্ত প্রশ্নে চেয়ারম্যান মাও কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজন থেকে শুরু করেন, একটি নতুন ধরণের পার্টি, সর্বহারা শ্রেণীর একটি পার্টি, আজ আমরা বলব মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী পার্টি; যার লক্ষ্য হচেছ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল ও রক্ষা করা, এবং এ কারণেই এটি আত্মরক্ষার্থে গণযুদ্ধের সূচনা, বিকাশ ও চালিয়ে যাওয়ার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, একটি পার্টি যা ব্যাপক জনগণের দ্বারা, ব্যাপক জনগণের যুদ্ধ গণযুদ্ধের দ্বারা অথবা শ্রেনীসমূহের ফ্রন্ট হিসাবে ব্যপক জনগণের ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা যুক্তফ্রন্টের দ্বারা টিকে থাকে । বিপ্লবের স্তরসমূহ ও স্তরগুলোর যে পর্যায়গুলো থাকতে পারে পার্টি সে অনুসারে গড়ে ওঠে ও নিজেই পরিবর্তিত হয়;; দ্বন্দ্ব হচেছ এর বিকাশের চালক যা এর হৃৎপিন্ডে সর্বহারা ও বুর্জোয়া এ দুই লাইনের সংগ্রামের রুপে অথবা সাধারণভাবে অসর্বহারা লাইন যা সারবস্তুতে এবং প্রধানত সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হিসাবে বাস্তবায়িত হয়। এটি পার্টির জীবনে মতার্দশের নির্ধারক গুরুত্ব আর একটি শুদ্ধিকরণ অভিযান গড়ে তোলার দিকে দিক নির্দেশ করে, যা সর্বহারা লাইনের আধিপত্যের নিশ্চয়তা বিধান করে এবং পার্টি নেতৃত্বকে এর লৌহ কঠিন নিয়ন্ত্রণে রেখে, পার্টি সংগঠনের সমস্ত ব্যবস্থাগুলো ও সদস্যদের একটি ন্যয্য ও সঠিক মতার্দিশক ও রাজনৈতিক লাইনে এক বৃহত্তর সমন্বয় সাধণে সাহায্য করে। নয়াগণতন্ত্রের নেতৃত্বদানকারী শ্রেণী হিসেবে এই পার্টি সর্বহারা শ্রেণীর জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিষ্ঠায় এবং প্রধানত সর্বহারা একনায়কত্বের প্রতিষ্ঠা, শক্তিশালীকরণ ও বিকাশে আর সাংস্কৃতিক বিপ্লবসমূহের মাধ্যমে মহান চূড়ান্ত লক্ষ্য কমিউনিজমের বিজয়ের জন্য দায়িত্ব পালন করে, এজন্য পার্টিকে সার্বিকভাবে সবকিছুকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
এক নতুন ধরণের বিপ্লবী বাহিনী (দি রেভ্যুলুশনারি আর্মি অব এ নিউ টাইপ), পার্টি কর্তৃক সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের স্বার্থের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্তব্য হাসিল করার জন্য এই বাহিনী তিনটি কর্তব্যের মাধ্যমে এর বৈশিষ্ট্য মূর্ত করে: যুদ্ধকরা, উৎপাদন করা যাতে পরজীবীসুলভ বোঝায় পরিণত না হয় এবং জনগণকে জাগ্রত ও সমবেত করা। এটি সর্বহারা শ্রেণীর মতার্দশ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (আজ) এবং পার্টি প্রতিষ্ঠিত সাধারণ রাজনৈতিক লাইন, সেইসাথে সামরিক লাইনের রাজনৈতিক বিনির্মাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি বাহিনী। এটা অস্ত্র নয়, গণভিত্তিক বাহিনী, এমন এক বাহিনী যা উদগত হয়, জনগণের ভেতর থেকে তাদেরই সর্বান্তকরণ সেবার মাধ্যমে তাদের সাথে সর্বদা সংযুক্ত থাকে, যা একে জনগনের মধ্যে জলের মাঝে মাছের মত সাঁতার কাটার সুযোগ করে দেয়। চেয়াম্যান মাও বলেছেন, বাহিনী ছাড়া জনগণের কিছুই নেই, একই সাথে তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন বাহিনীর ওপর পার্টির নিরংকুশ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা, আর তার মহান নীতি: পার্টি বন্দুককে কমান্ড করে এবং আমরা কখনোই এর অন্যথা হতে দেবনা। নতুন ধরণের বাহিনী গঠনের জন্য নীতি ও রীতি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি চেয়ারম্যান নিজেই একটি প্রতিবিপ্লবী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নেতৃত্ব দখল করে পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীর অপব্যবহার ঠেকানোর ডাক দেন এবং অন্য যে কারো চেয়ে লেনিনের গণমিলিশিয়া সংক্রান্ত্র থিসিস অধিক বিকশিত করে জনগণের সার্বিক সশস্ত্রকরণে এগিয়ে যান, এভাবে জনগণের সশস্ত্র সমুদ্র অভিমুখে পথ উন্মোচন ও উপায় নির্দেশ করেন, যা কিনা আমাদের চালিত করবে জনগণ ও সর্বহারা শেণীর নিশ্চিত মুক্তির দিকে।
চেয়ারম্যান মাও ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি সর্বপ্রথম যুক্তফ্রন্ট সংক্রান্ত একটি পূর্নাঙ্গ তত্ত্বের বিকাশ ঘটান এবং তার নিয়মবিধি প্রতিষ্ঠা করেন। বিপ্লবে সর্বহারা শ্রেণীর একাধিপত্যের নিশ্চয়তা হিসেবে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে একটি ফ্রন্ট, সামাজিক শ্রেণীসমূহের একটি ঐক্যফ্রন্ট যেখানে কমিউনিস্ট পার্র্টির প্রতিনিধিত্বে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্ব দেয়, সংক্ষেপে, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন একটি ঐক্যফ্রন্ট; সর্বহারা ও জনগণের স্বার্থে গণযুদ্ধ, বিপ্লব, ক্ষমতার দখলের জন্য একটি ঐক্যফ্রন্ট।সংশ্লেষণে, ঐক্যফ্রন্ট হ’ল মূলত সশস্ত্র গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবের মধ্যে লড়াই চালানোর জন্য প্রতিবিপ্লবী শক্তির বিরুদ্ধে বিপ্লবী শক্তির জোট। ঐক্যফ্রন্ট, অবশ্যই বিপ্লবের প্রতি স্তরে একই রকম নয় এবং উপরন্তু প্রতিটি স্তরের বিবিধ ঐতিহাসিক পর্যায়ে এর রয়েছে বিশেষত্ব, তেমনি একটি নির্দিষ্ট বিপ্লবের যুক্তফন্ট বৈশ্বিক কাতারের ঐক্যফ্রন্টের সমরূপ হতে পারেনা, যদিও উভয়ই একই সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করে। এছাড়া গুরুত্বারোপ করা দরকার, জাপ-বিরোধী যুদ্ধ এগিয়ে চলাকালে চেয়ারম্যান মাও যুক্তফ্রন্টকে যৌথ একনায়কত্বের এক রূপ হিসাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ফ্রন্ট ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন, এটা এমন একটি প্রশ্ন, যারা গণতান্ত্রিক বিপ্লব মোকাবেলা করছেন, তাদের জন্য বিশেষভাবে অধ্যয়ণের দাবি রাখে ।
৪। গণযুদ্ধ হল আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণীর সামরিক তত্ত্ব; যাতে প্রথমবারের মতো নিয়মাফিক ও সম্পূর্ণরূপে সারসংকলিত হয়েছে, সর্বহারা শ্রেণী কর্তৃক পরিচালিত সংগ্রাম, সামরিক এ্যাকশনসমূহ ও যুদ্ধগুলোর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং জনগণের সশস্ত্র সংগ্রামআর বিশেষত চীনের বিরতিহীন যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতা। চেয়ারম্যান মাওয়ের মাধ্যমেই সর্বহারা শ্রেণী তার সামরিক তত্ত্ব অর্জনে সফলতা লাভ করেছে; তাসত্ত্বেও এ প্রশ্নে প্রচুর বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। এসবের অনেকটা গজায় চীনের গণযুদ্ধকে কীভাবে দেখা হবে তা থেকে, সাধারনত, একে সংকীর্ণ, অবজ্ঞাপূর্ণভাবে স্রেফ গেরিলাযুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; এটা কেবল বোঝাপড়ার ঘাটতিই প্রকাশ করে যে চেয়ারম্যান মাওয়ের মাধ্যমে গেরিলা যুদ্ধ রণনৈতিক চরিত্র অর্জন করে; বরং এর অনিবার্য তরলতা (ফ্লুডিটি) থেকে এটি যে চলমানতা, এক চলমান যুদ্ধ, অবস্থান যুদ্ধ, ভেতর থেকে অভূত্থানের সাথে বাহির থেকে আক্রমণকে সমন্বিত করে ছোট, মাঝারি আর বড় শহরসমূহ লক্ষকোটি অধিবাসী সমেত দখল করার রণনৈতিক আক্রমনের বিরাট পরিকল্পনাগুলো সৃষ্টি করে, গেরিলাযুদ্ধের বিকাশকে সেদিক থেকে বোঝা হয় না। সুতরাং, উপসংহারে, চীন বিপ্লবের চারটি পর্যায়, এবং প্রধানত কৃষি যুদ্ধ থেকে শুরু করে গণমুক্তিযুদ্ধ, তাদের মধ্যে জাপবিরোধী যুদ্ধকে বিবেচনা করে বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে, একটি বিশাল জনসংখ্যা এবং জনগণের বিপুল সমাবেশ ও অংশগ্রহণের মাঝে পরিচালিত বিপ্লবী যুদ্ধটির বিভিন্ন দিক ও জটিলতা প্রদর্শন করে, সেই যুদ্ধে সব ধরণের উদাহরণ রয়েছে; এবং প্রধান বিষয়টি অসাধারণভাবে অধ্যয়ন করা হয়েছে এবং দক্ষতার সাথে এর নীতি, আইন, কৌশল, কৌশল, নিয়মাবলী ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রকাণ্ড অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে আর মার্কসাদ-লেনিনবাদ যা প্রতিষ্ঠিত করেছিল তার ভিত্তিতে, চেয়াম্যান মাও গড়ে তুলেছিলেন সর্বহারা শ্রেণীর সামরিক তত্ত্ব: গণযুদ্ধ।
আমাদের অবশ্যই পুরোপুরি মনে রাখতে হবে যে, পরবর্তীতে চেয়ারম্যান মাও পারমানবিক বোমা ও মিসাইলের অস্তিত্ব জেনে এবং চীন কর্তৃক তা অধিকার করে গণযুদ্ধকে টেকসই ও বিকশিত করেন, যাতে পারমাণবিক অস্ত্র এবং যুদ্ধের নতুন অবস্থার অধীনে শক্তি ও পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে তা পরিচালনা করা যায়। সংশ্লেষণে, এমনকি পারমানবিক যুদ্ধ মোকাবেলার ক্ষেত্রেও গণযুদ্ধ হচেছ সর্বহারা শেণী ও জনগণের হাতিয়ার।
একটি মূখ্য ও নির্ধারক প্রশ্ন হচেছ গণযুদ্ধের সার্বজনীনতা এবং বিভিন্ন ধরনের বিপ্লব আর প্রতিটি বিপ্লবের মূর্ত নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তার প্রয়োগের ন্যায্যতা। পেত্রগ্রাদেরর মতো অভূত্থান, ফ্যাসিবাদবিরোধী গণপ্রতিরোধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইউরোপীয় গেরিলাদের পাশাপাশি আজ ইউরোপে যে সশস্ত্র লড়াই চলছে, তার পূনরাবৃত্তি হয়নি এবং সর্বোপরি, অক্টোবর বিপ্লব শুধুমাত্র একটি অভ্যুত্থানই ছিল না, ছিল কয়েক বছর স্থায়ী একটি বিপ্লবী যুদ্ধ, এটা বিবেচনায় নিলে মূখ্য প্রশ্নটি বুঝতে সহায়ক হবে। ফলতঃ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে বিপ্লব কেবল বিপ্লবী যুদ্ধ হিসেবেই আর্বিভূত হতে পারে যা আজকের দিনে স্রেফ গণযুদ্ধ।
শেষত, আজকে যেকোন সময়ের চেয়ে, আমরা কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী, সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের নিজেদেরকে এক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়া দরকার: “হ্যাঁ, আমরা বিপ্লবী যুদ্ধের সর্বশক্তিময়তার তত্ত্বের সপক্ষে, এটা খারাপ নয়, ভাল, এটা মার্কসবাদী”; এর অর্থ হচেছ গণযুদ্ধের অপরাজেয়তার পক্ষে থাকা।
৫। ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব হল চেয়ারম্যান মাও কর্তৃক মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সর্বোৎকৃষ্ট বিকাশ, এটি সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কতন্ত্রের অধীনে বিপ্লব অব্যাহত রাখার অমীমাংসিত সমস্যার মহান সমাধান: “এটা আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একটি অধিকতর গভীর ও বিস্তৃত নতুন স্তরকে প্রকাশ করে।
এটি কোন্ পরিস্থিতি যা নিজেকে প্রকাশ করে? মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তে যেমন বলা হয়েছে: “উৎখাত হওয়া সত্ত্বেও বুর্জোয়ারা ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় জনগণকে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং জনগণের মনকে জয় করতে শোষক শ্রেণীর পূরোনো ধ্যান-ধারণা, সংস্কৃতি, অভ্যাস ও রীতিনীতিগুলি ব্যবহার করার চেষ্টা করে। সর্বহারা শ্রেণীকে করতে হবে ঠিক তার বিপরীত: মতাদর্শগত পরিমণ্ডলে বুর্জোয়াদের সকল চ্যালেঞ্জের প্রতি নির্মম ও সম্মুখে আঘাত হানাতে হবে এবং তার নিজস্ব নতুন ধারণা, সংস্কৃতি, অভ্যাস ও রীতিনীতি ব্যবহার করে পুরো সমাজের চেতনার অবয়বে পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমাদের বর্তমান লক্ষ্য হচেছ সংগ্রামের মাধ্যমে যারা নেতৃত্বকারী পদ দখল করে আছে আর পুঁজিবাদী পথ অনুসরণ করছে, তাদের ধ্বংস করা, একাডেমিক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া “কর্তৃপক্ষ”কে সমালোচনা ও বর্জন করা, বুর্জোয়া ও অন্যান্য শোষক শ্রেণীর মতার্দশকে সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করা, এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংহতি ও বিকাশ সহজতর করতে, সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক ভিত্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না এমন শিক্ষা, সাহিত্য ও শিল্পকলা এবং উপরিকাঠামোর অন্যান্য পরিমণ্ডলকে রূপান্তর করা।”
এসকল পরিস্থিতির মধ্যেই দুনিয়ায় এ পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, আর সর্ববৃহৎ গণজাগরণটি সংঘটিত হয়েছিল, এবং যার উদ্দেশ্য চেয়ারম্যান মাও কর্তৃক নিম্নরূপে সংজ্ঞায়িত হয়েছিল: “সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বকে সুসংহত করতে, পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা রোধ করতে এবং সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য বর্তমান মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয় এবং অত্যন্ত সময়োপযোগী।”
আসুন, আমরা দুটি প্রশ্নের ওপরও গুরুত্বরোপ করি: ১) জিপিসিআর ক্ষমতায় সর্বহারা শ্রেণীর সংহতকরণের অভিমুখে সর্বহারা একনায়কত্বের বিকাশের এক মাইলফলককে বোঝায়, যা বিপ্লবী কমিটিগুলির আকার ধারণ করেছিল; ২) চীনে ১৯৭৬ সালের প্রতিবিপ্লবী ক্যুর পর পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নেতিকরণ নয় বরং পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পাল্টা-পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্যে লড়াই এবং বিপরীতে এটা কমিউনিজমের দিকে মানব জাতির অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিশাল ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে।
৬। বিশ্ব বিপ্লব: চেয়ারম্যান মাও একত্ব রূপে বিশ্ব বিপ্লবের গুরুত্বের ওপর জোর দেন, এই ভিত্তি থেকে যে বিপ্লব হচেছ প্রধান প্রবনতা, যেহেতু প্রতিদিন সাম্রাজ্যবাদের পঁচন বাড়ছে এবং প্রত্যেক বছর সবচেয়ে ব্যাপকতর জনগণ ভূমিকা নিচ্ছে এবং নেবে, অনুভূত হবে এক অপ্রতিরোধ্য রূপান্তকারী শক্তিরূপে, এবং পুনরোক্ত করেন এই মহান সত্য: হয় আমরা সবাই কমিউনিজমে পৌঁছবো অথবা কেউই পৌঁছতে পারবো না। সাম্রজ্যবাদের যুগের এই সুনির্দিষ্টি পরিপ্রেক্ষিতে ”পরবর্তী ৫০ অথবা ১০০ বছর’’ – এর মহা-ঐতিহাসিক মূহুর্তে এবং সেইসূত্রে যে সময়কাল, যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সূচনা করে; যে কাগুজে বাঘেরা একাধিপত্যের জন্য সংগ্রামরত আর বিপ্লবকে পারমানবিক যুদ্ধের হুমকী দিচেছ, এর মোকাবেলায়, প্রথমত দরকার একে নিন্দা করা এবং দ্বিতীয়ত, একে প্রতিরোধ করতে গণযুদ্ধ ও বিপ্লব সম্পাদনের আগাম প্রস্তুতি নেয়া। অন্যদিকে নিপীড়িত জাতিসমূহের ঐতিহাসিক গুরুত্বের সূত্র ধরে এবং অধিকন্তু সাম্রাজ্যাবদের অবক্ষয়ের প্রক্রিয়ায় যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কগুলোর উৎপত্তি ঘটছে, তাদের সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে, চেয়ারম্যান তাঁর থিসিস প্রস্তাব করেনঃ ‘‘তিন বিশ্ব আকার পেয়েছে’’। এসব কিছেই বিশ্ব বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার দিকে চালিত করে। দুঃখের বিষয় এই সব অসীম গুরুত্বপূর্র্ণ প্রশ্নের ওপর চেয়ারম্যান মাওয়ের রচনা ও বিবৃতিসমূহের ব্যাপারে আমরা প্রায় কিছুই জানিনা, তবু যে সামান্যটুকু জানা গেছে তা চমৎকার সম্ভাবনাটি দেখায় যা তিনি লক্ষ করেছিলেন; এবং সর্বহারা বিশ্ববিপ্লবকে বুঝা ও সেবা করার জন্য এ মহান দিক নির্দেশনাগুলো আমাদের অতি অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।
৭। উপরিকাঠামো, মতাদর্শ, সংস্কৃতি ও শিক্ষা: এই সমস্যাগুলি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত বিষয়াদি চেয়ারম্যান মাও কর্তৃক নিখুঁত ও গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়েছে এবং সমাধান করা হয়েছে; অতএব, এটি আরও একটি মৌলিক বিষয় যা মনোযোগের দাবি রাখে।
উপসংহারে, এই মৌলিক প্রশ্নলোতে যে সারবস্তু দেখা গেছে, যারা দেখতে ও বুঝতে চায় তাদের কাছে পরিস্কারভাবে প্রদর্শন করে যে আমাদের রয়েছে মার্কসবাদের নতুন, তৃতীয় ও উন্নত স্তর: মাওবাদ এবং আজ একজন মার্কসবাদী হওয়ায় মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী এবং প্রধানত, মাওবাদী হওয়ার দাবী থাকে।
যেসব বিষয়বস্তু সম্পর্কে যা কিছু উন্মোচন করা হল তা আমাদের দুটো প্রশ্নের দিকে ধাবিত করেঃ
মাওবাদে মৌলিক বিষয়টা কি? মাওবাদে মৌলিক বিষয় হল ক্ষমতা । সর্বহারা শ্রেণীর জন্য ক্ষমতা, সর্বহারা একনায়কত্বের জন্য ক্ষমতা, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বধীন এক সশস্ত্র বাহিনীর ভিত্তিতে ক্ষমতা। আরও স্পষ্টভাবে: ১। গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বাধীনে রাজনৈতিক ক্ষমতা। ২। সমাজতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবসমূহে সর্বহারা একনায়কত্বের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা। ৩। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র বাহিনীর ভিত্তিতে গণযুদ্ধের মাধ্যমে জয় করা ও সুরক্ষিত রাজনৈতিক ক্ষমতা।
আর মাওবাদ কী? মাওবাদ হচেছ গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সর্বহারার নেতৃত্ব অর্জন, সমাজতন্ত্রের বিকাশ এবং সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব আকারে সর্বহারা একনায়কত্বধীনে বিপ্লব অব্যাহত রাখার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মার্কসবাদ-লেলিনবাদের একটি নতুন, তৃতীয় ও উন্নত স্তরে বিকাশ; যখন এ যাবতকালে দেখা সবচেয়ে জটিল ও বিরাট যুদ্ধগুলো ও সমকালিন সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে নির্মম সংগ্রামের মাঝে সাম্রজ্যবাদ তার পচনকে গভীরতর করছে এবং বিপ্লব ইতিহাসের প্রধান প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাওবাদ কেন্দ্রিক সংগ্রাম প্রসঙ্গে সংক্ষেপে চীনে মাওসেতুঙ চিন্তাধারার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৩৫ সালে সুনাই অধিবেশনে, যখন চেয়াম্যান মাও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে আসীন হন; ১৯৪৫ সালে ৭ম কংগ্রেস সম্মত হয়েছিল যে সিপিসি মার্কসবাদ-লেলিনবাদ মাওসেতুঙ চিন্তাধারা দ্বারা পরিচালিত ছিল, যে বিশেষীকরণ ৮ম কংগ্রেসে এক ডানপন্থি লাইন প্রভাব বিস্তার করার কারণে অবদমিত হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের নবম কংগ্রেস মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সারসংকলন করে আর সম্মত হয় যে সিপিসি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা দ্বারা পরিচালিত, সেখানে এ অগ্রগতি ঘটেছিল।
আন্তর্জাতিক স্তরে এটা ১৯৫০ এর দশক থেকে প্রতিপত্তি অর্জন করে, তবে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমেই কেবল তা প্রচণ্ডভাবে ছড়িয়ে পড়ে, এর মর্যাদা সজোরে উন্নীত হয়, চেয়ারম্যান মাও বিশ্ববিপ্লবের প্রধান নেতা এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের এক নতুন স্তরের জন্মদাতা হিসেবে স্বীকৃত হন, এভাবে প্রচুর সংখ্যক কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক মার্কসবাদ-লেলিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা আখ্যাটি গৃহীত হয়। বিশ্ব পর্যায়ে মাওবাদ খোলাখুলি ও প্রচণ্ডভাবে সমকালীন সংশোধনবাদকে মোকাবেলা করেছিল তাকে গভীর ও জোরালোভাবে উম্মোচিত করে, সিপিসি তার নিজের সারিতেও তেমনটি করেছিল, যা চেয়াম্যানের মহান লাল ব্যানার: আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শের নতুন, তৃতীয় ও উন্নত স্তরকে আরো ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। বর্তমানে, (১৯৮৮) মাওবাদ সোভিয়েত, চীনা ও আলবেনীয় সংশোধনবাদের ত্রিমূখী আক্রমণ মোকাবেলা করছে। তবে, এর বাইরেও, যারা চেয়ারম্যানের দুর্দান্ত অবদান এবং এমনকি তাঁর মার্কসবাদের বিকাশকেও স্বীকৃতি দিয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন যে আমরা এখনও মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পর্যায়ে রয়েছি এবং অন্যরা যারা কেবল মাও সেতুং চিন্তাকেই গ্রহণ করেন কিন্তু মাওবাদকে মোটেও নয়।
দেশে স্পষ্টতই সংশোধনবাদীরা যারা তাদের বিভিন্ন প্রভু গরবাচেভ, দেং, আলিয়া বা কাস্ত্রোর অঙ্গুলি হেলনকে অনুসরণ করে তারা মাওবাদকে উগ্রভাবে আক্রমণ করে এবং আক্রমণ চালিয়ে যায়; তাদের মধ্যে, দেল প্রাদোর কট্টর সংশোধনবাদ ও তার গ্যাং ‘‘পেরুর কমিউনিস্ট পাটি’’; স্বঘোষিত পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি, প্যাট্রিয়া রোজার চূড়ান্ত দ্বিমূখীতা যারা ১৯৭৬-এ তেঙ ক্ষমতার বাইরে নিক্ষিপ্ত হলে তার নিন্দা জানিয়ে নিজেদের ‘‘মহান মাওবাদী’’ হিসেবে তুলে ধরলেও পরে তেঙ-এর ভৃত্যে পরিণত হয়; একইসাথে তথাকথিত ‘‘ইজকুয়েরদা ইউনিদা’’ (ঐক্যবদ্ধ বাম)-যার অন্তঃস্থলে ঢুকে পড়েছে নানা পদের ভূয়া মার্কসবাদী ও সুবিধাবাদীদের দ্বারা গছানো সকল সংশোধনবাদী এবং এমনকি মার্কসবাদবিরোধী অবস্থান, তাদের মাওবাদ-বিরোধীতার বিরুদ্ধে আমাদের অতি অবশ্যই নিন্দা জানাতে হবে, উম্মোচন করতে হবে এবং নিরলস লড়াই চালাতে হবে। গণযুদ্ধের বিকাশ ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের জন্য কর্মকাণ্ডে সংশোধনীদের নিরলস লড়াই করতে উম্মোচনকারী আয়না হিসেবে মাওবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা; রণনৈতিক চরিত্রের এক অনিবার্য এবং অবহেলার অযোগ্য কাজ।
১৯৬৬ সালে চেয়ারম্যান গঞ্জালোর নেতৃত্বাধীন ফ্রাকশনের মাধ্যমে পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি, তার পুনর্গঠনকে চালিত করে, গ্রহণ করে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ; ১৯৭৯ সালের স্লোগান ‘‘মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারাকে উর্দ্ধে তুলে ধরুন, রক্ষা করুন ও প্রয়োগ করুন’’, ১৯৮১ সালে ‘‘ মাওবাদের পথে’’ এবং ১৯৮২ সালে আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শের অবিচেছদ্য অঙ্গ ও উচচতম বিকাশ হিসাবে মাওবাদ: “মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ”। গণযুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমরা মাওবাদ যা বোঝায় তা আরও গভীরভাবে বুঝতে পেরেছি এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ, প্রধানত মাওবাদকে প্রক্ষা এবং প্রয়োগের প্রতি একান্তভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছি; এবং একে বিশ্ববিপ্লবের কমান্ড ও পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠার সহায়তায় অক্লান্ত প্রচেষ্ঠা চালাচ্ছি; এটি একমাত্র অমলিন লাল পতাকা যা কমিউনিজমের সোনালী ও ঝলমলে লক্ষ্যের দিকে সর্বহারা শ্রেণী, নিপীড়িত জাতি ও বিশ্বজনগণের লৌহকঠিন সৈন্যদলের আপোসহীন, লড়াকু যাত্রার বিজয়ের গ্যারান্টি।

