জুলাই অভ্যুত্থানকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাইনারি অপজিশন দেখা যাচ্ছে। একপক্ষ বলছে জুলাই হল মূলত “ম্যাটিকুলাস ডিজাইন”, কালার রেভল্যুশন; জনগণকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরেক পক্ষ বলছে জুলাই মূলত জনগণের সংগ্রাম, এর সুযোগ নিতে ষড়যন্ত্রকারীরা ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করবে, এটা খুবই স্বাভাবিক, এই ষড়যন্ত্র নির্ধারক কিছু নয়।

আমরা মনেকরি, এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিই একদেশদর্শী। তারা জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বৈতচরিত্রকে স্বীকার করেনা। সেগুলো কেবল একটি দিককে সমগ্র হিসাবে উপস্থিত করে এবং দুই প্রতিক্রয়াশীল শিবিরের বয়ানকে জোরদার ও সেবা করে।

একাত্তর সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনতার লড়াই ছিল, জনগণের লড়াই ছিল। পাকিস্তানের উপনিবেশিক শোষণের অবসান ছিল বিরাট ঐতিহাসিক অর্জন। এটা ছিল একাত্তরের প্রধান দিক। কিন্তু একাত্তরের লড়াইয়ের ফসল বাঙালি উঠতি বুর্জোয়া ও জোতদার-মহাজন শ্রেণীর দল আওয়ামী লীগের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দ্বারা ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধে “বন্ধুত্বপূর্ণ সাহায্যের” মাধ্যমে বাংলাদেশ রুশ-ভারতের উপনিবেশিক আধিপত্য সৃষ্টি হয়েছিল। একাত্তরের লড়াইয়ের গণচরিত্র ও মহৎ অর্জন সত্ত্বেও নেতৃত্বের শ্রেণী চরিত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজের চরিত্র গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল।

একাত্তরের এই দ্বান্দ্বিক বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করে একদেশদর্শী হলে আপনি ভারত-লীগ অথবা পাক-জামাতের প্রতিক্রিয়াশীল বয়ানে ফেঁসে যেতে বাধ্য। প্রথম ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্বাসঘাতক আওয়ামী লীগকে গণযুদ্ধের চ্যাম্পিয়ান আর ভারতের উপনিবেশিক আধিপত্যকে পরম বন্ধুত্ব মনে হবে, মুজিবের পুতুল সরকার ও বাকশালকে মনে হবে জনগণের সরকার আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে জনগণের যুদ্ধকে কেবল ভারতের ষড়যন্ত্র আর গণহত্যাকারী পাকসেনা ও জামাতকে মনে হবে ভারত ও তার চরদের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরি!

কমরেড সিরাজ সিকদার একাত্তরের যুদ্ধের এই দ্বৈত চরিত্র তুলে ধরেছিলেন।

একই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে জুলাইয়ে। একাত্তর যেমন পাক উপনিবেশবাদের সাথে পূর্ববাংলার জাতি ও জনগণের তীব্র দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ, তেমনি জুলাই ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদের তীব্র দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। একাত্তর যেমন স্রেফ ভারতের ষড়যন্ত্র ছিল না, তেমনি জুলাই স্রেফ মার্কিন কালার রেভ্যুলেশন নয়। আওয়ামী লীগ যেমন জনগণের শক্তির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতা দখলে অক্ষম হওয়ায় পালিয়ে ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়েছিল; ক্ষমতা লাভের জন্য বাংলাদেশকে ভারতের কাছে তুলে দিয়েছিল, তেমনি গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি ক্ষমতা লাভের আশায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসল মার্কিনের দালাল তৃতীয় শক্তি ও উগ্র ধর্মবাদী শক্তির হাতে তুলে দিয়েছে। শ্রমিক শ্রেণী ছাড়া আর কোন শ্রেণীর পক্ষেই জনগণের শক্তির ওপর নির্ভর করে সত্যিকার স্বনির্ভর অভ্যুত্থান অথবা যুদ্ধ পরিচালনা সম্ভব নয়, বিশ্বাসঘতকতা সেখানে অবশ্যম্ভাবী।

যারা জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এই দ্বৈত চরিত্র উপেক্ষা করে একদেশদর্শী হবেন তারা প্রতিক্রিয়াশীল বয়ানে ফেঁসে যেতে বাধ্য।

আপনি যদি জুলাই অভ্যুত্থানে জনগণের সাথে ফ্যাসিবাদের তীব্র দ্বন্দ্ব, জনগণের অসীম বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা, গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট পতনের মত অর্জনকে অস্বীকার করে কেবল মার্কিন ডিজাইন দেখেন তবে সেটা ভারত-লীগের প্রতিক্রিয়াশীল চশমা চোখে পরা ছাড়া কিছু নয়। তখন আওয়ামী লীগ ও হাসিনাকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী মনে হবে এবং গণহত্যাকেও মনে হবে ন্যায্য অথবা ষড়যন্ত্র।

আবার আপনি যদি কোন মার্কিন ডিজাইনই না দেখেন, কেবলই জনগণের অভ্যুত্থানই দেখেন, তবে নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতা, স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানকে মার্কিনের দালালদের হাতে তুলে দেয়ার সত্যকে আপনি দেখতে পাবেন না। মার্কিনের দালাল তৃতীয় শক্তি ও উগ্র ধর্মবাদী শক্তির ইন্টারিম সরকারকে মনে হবে অভ্যুত্থানের সরকার। সুতরাং আপনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে কোন না কোন প্রকারে তাকে সমর্থন করবেন। যা আসলে হবে মার্কিনের দালালদের চোখে জগৎ দেখারই সামিল।

সুতরাং কমরেড সিরাজ সিকদারের মত শ্রমিক শ্রেণীর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই আমাদের জুলাইয়ের রাজনৈতিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ করা উচিত। তাহলে আমরা বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণে সক্ষম হব এবং কর্মের দিশা ঠিক করতে পারব। নয়ত চিরকাল আমাদের প্রতিক্রিয়াশীলদের খেলার পুতুল হয়েই থাকতে হবে।

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন