৫ মে ২০১৩ হাসিনার ফ্যাসিস্ট বাহিনী হেফাজতে ইসলামের লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশে রাতের অন্ধকারে বর্বর হামলা ও হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করেছিল। নিরপেক্ষ হিসাবে কয়েকজন পুলিশসহ অন্তত ৫৮ থেকে ৬১ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে গণসমাবেশের ওপর এই হামলা ছিল আওয়ামী ফ্যাসিকরণের এক মাইল ফলক।
হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির সাথে আমাদের বিরোধ ছিল। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, হেফাজত নেতাদের ধর্ম রক্ষার নামে উন্মাদনা তৈরী করে শাসক শ্রেণীর দুই জোটের ক্ষমতার হানাহানিতে ধর্মপ্রাণ আলেম-ওলেমা-জনতাকে ফুট সোলজার হিসাবে ব্যবহার করার জঘন্য কর্মকাণ্ডের প্রতি রাজনৈতিক বিরুদ্ধতা। তা সত্ত্বে, সেদিন আমরা আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের উৎখাতের ৯ মাস পার হলো। অথচ সেই হত্যাকাণ্ডের কোন বিচারের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান নয়। আমরা অবিলম্বে এই ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, শ্বেতপত্র প্রকাশ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারেরর দাবি জানাই।
সেইসাথে আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, শাপলার সমাবেশও ছিল শাসক শ্রেণীর দুই জোটের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফল। আসন্ন নির্বাচনে গদী নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ যুদ্ধপরাধীদের বিচারকে বিএনপি-জামাত জোটে ভাঙন ঘটাবার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছিল। জামাত ও আওয়ামী লীগের সমঝোতার প্রকাশ ঘটেছিল কাদের মোল্লার রায়ে।
একাত্তরের নারকীয় গণহত্যার সহযোগীদের বিচার পাওয়া ছিল এই জাতি ও জনগণের এক ন্যায়সঙ্গত আকাঙ্ক্ষা। যা বারবার পদদলিত করেছে শাসকরা। ফলে কাদের মোল্লার রায় জনগণ বিশেষত শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। এর সুযোগ গ্রহণ করেছিল আওয়ামী লীগের কট্টর জামাতবিরোধী অংশ। তারা তাহরির স্কয়ার স্টাইলে কালার রেভ্যুলেশনের পদ্ধতি ব্যবহার করে জনগণের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভকে কাজে লাগায়। ফলে যে আন্দোলন হওয়ার কথা ছিল সরকারের বিরুদ্ধে সেটা পরিণত হয়, সরকারের আনুকুল্যে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক আধিপত্যের হাতিয়ারে। সেটা বুঝতে পেরেই আমরা শাহবাগ আন্দোলনে যোগদানে বিরত ছিলাম।
২০০৭ এর এক-এগারোর কারণে বিএনপি-জামাত জোট রাজনৈতিক-সাংগঠনিক গভীর ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল। ২০১২-১৩ নাগাদ তারা দুর্বলতা কাটিয়ে আন্দোলন গুছিয়ে তুলেছিল। এ অবস্থায় শাহবাগ তাদের এজেন্ডাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। শাহবাগ পরিণত হয় বিরোধী দলের জন্য এক ধরাশায়ী করা আক্রমণ আর পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভের জন্য আওয়ামী লীগের গ্যারান্টি। জামাত ও তাদের নেতাদের ভবিষ্যৎ পড়ে হুমকির মুখে।
এই অবস্থায় মাহমুদুর রহমান জামাত জোটের ত্রাণ কর্তা হিসাবে হাজির হয়। সে শাহবাগের ব্লগারদের পুরোনো ধর্মবিদ্বেষী লেখাগুলো আমার দেশ পত্রিকায় ছাপিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরী করে। এভাবে হেফাজতে ইসলামকে শাহবাগের বিরুদ্ধে নামিয়ে কাউন্টার হেজিমনি তৈরীর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
এভাবে শাসক শ্রেণীর দুই জোট ক্ষমতার হানাহানিতে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। তারা উন্মাদনা তৈরী করে জনগণের ভেতর বৈরী বিভক্তি সৃষ্টি করে। যার ফলে কেবল শাপলার হত্যাকাণ্ডেরই জন্ম দেয়নি, ২০১৪-১৫ সাল জুড়ে এই ফ্যাসিবাদী উন্মাদনা ও খুনোখুনি জাতি ও জনগণকে বিপর্যস্ত করেছিল এবং আজও আমরা তার ফল ভোগ করে চলেছি।
আজও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে একইরকম উন্মাদনা তৈরী করবার চেষ্টা চলছে। যদিও এই এনজিও মার্কা নারী সংস্কার ও তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আমরা গ্রহণ করিনা। তবুও নারীর গণতান্ত্রিক অধিকার প্রশ্নে বিদ্বেষ তৈরীসহ আগামী নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ধর্মের নামে ফ্যাসিবাদী উন্মাদনা তৈরীর যে চেষ্টা চলছে, সে বিষয়ে সকলকে সচেতন ও সতর্ক করা দরকার। বিশেষত এই ধর্মোন্মাদনার খপ্পর থেকে মুক্ত রাখার জন্য আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, শাপলা হত্যাকাণ্ডে নিহতদের রক্তের দাগ না শুকাতেই এই বেইমানরা খোদ শাপলা হত্যাকাণ্ডের মূল খুনি; হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ ঘোষণা করে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। হাসিনার ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করেছিল। ২৪-এর আন্দোলনেও তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলোচনায় সরকারকে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল। হাসিনার দোসর এই বিশ্বাসঘাতকদের বিচারও জনতার আদালতে আমরা করব।
আসুন, আমরা শাসক শ্রেণীর ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার দ্বন্দ্বে এনজিও মার্কা আধুনিকতা, উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের খপ্পর সম্পর্কে সচেতন হই। গণতান্ত্রিক কর্মসূচির ভিত্তিতে জাতি ও জনগণের ঐক্য গড়ে তুলি।

