পাক-ফ্যাসিস্টদের ভৌতিক স্বর

মাহমুদুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করা দরকার- কারা ১৯৪৭ এর পর বাঙালি মুসলামানের পক্ষে কাজ করেছিল? মুসলিম লীগ, জামাত? আওয়ামী লীগ?

কমিউনিস্ট নীতির দিক থেকে ভুল হলেও এটা ফ্যাক্ট যে, ১৯৪৭-এর আগে সর্ব ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান সৃষ্টিকে সমর্থন করেছিল, কংগ্রেস-লীগের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরীর আওয়াজ তুলেছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে কমরেড সিরাজ সিকদার, দেবেন-বাসার ও শেষমুহুর্তে মওলানা ভাসানী ছাড়া সকল বামধারাই অখণ্ড পাকিস্তানের নীতি ত্যাগ করেনি। চীনপন্থী বামরা একটা সময়কাল পর্যন্ত “ডোন্ট ডিস্টার্ব আইউব” পলিসি নিয়েছিল। রুশপন্থীরা অখণ্ড পাকিস্তানেই সংসদীয় শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের কথা বলত।

উপরোক্ত অবস্থানের কারণে মার্কিনের দালাল পাক ফ্যাসিস্ট শাসক শ্রেণীর শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলেও, আন্তর্জাতিক বা জাতীয় রাজনীতির দিক থেকে ভারতের দালালি করার কোন বাস্তব কারণ ছিল না।

পাক ফ্যাসিস্টদের মার্চের গণহত্যার পর বামপন্থীদের একাংশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। রুশ-ভারত মৈত্রী চুক্তির পর রুশপন্থীরা ভারতের আশ্রয়ে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়। মেননদের নেতৃত্বে চীনপন্থী গ্রুপটি ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে কৌশলগত মিত্র হিসাবে গ্রহণ করে। এভাবে তারা ভারত ও লীগের দোসরে পরিণত হয়েছিল, তার আগে নয়।

একাত্তরে এবং একাত্তরের পরেও কমরেড সিরাজ সিকদার ও চীনপন্থী গ্রুপগুলো ভারতীয় সম্প্রসারণবাদবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যহত রেখেছিলেন এবং এখনো একই রাজনীতি ধারণ করেন।

সুতরাং ১৯৪৭ থেকেই বামপন্থীরা ভারতের দালাল ছিল, বাঙালি মুসলামানের বিরোধিতা করেছে, এই দাবির কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। প্রকৃতপক্ষে ৪৭ পরবর্তী সকল গণআন্দোলনে বামপন্থীদের অগ্রগামী ভূমিকা প্রমাণ করে, তারা পূর্ববাংলার জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেছে।

তবে হ্যাঁ, আরেকটা ফ্যাক্ট হচ্ছে, পাক ফ্যাসিস্ট শাসকশ্রেণি ও তাদের দোসররা পূর্ববাংলার জনগণের ন্যায্য সংগ্রামকে বরাবরই ভারতের দালালদের দুষ্কৃতি তকমা দিয়ে দমন-পীড়ন চালাত। মাহমুদুর রহমানের কণ্ঠে আজ সেই পাক ফ্যাসিস্টদের ভৌতিক স্বর শোনা যাচ্ছে।

মাহমুদুর রহমানের সাথে ফ্যাসিবাদের যোগ পুরনো।
বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের দুই মেরু; উগ্রবাঙালি জাতীয়তাবাদী আর ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের মধ্যে দ্বিতীয়টির নির্মাণে তার অবদান বিরাট।

২০১৩ সালে লীগ-জামাতের নির্বাচনী সমঝোতার প্রকাশ ছিল কাদের মোল্লার রায়। জনসাধারণ বিশেষত, শিক্ষিত শহুরে তরুণরা এতে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। ভারতপন্থী অনলাইন এক্টিভিস্টরা মাঠে নামলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষুব্ধ তরুণরা সমবেত হতে শুরু করে। অবস্থা বুঝে আওয়ামী লীগ অবস্থান পাল্টে আন্দোলনে সমর্থন দিতে শুরু করে এবং একে নির্বাচনে বিজয় ও ফ্যাসিবাদ কায়েমের হাতিয়ারে পরিণত করে। বিএনপি ও জামাতকে রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য মাহমুদুর রহমান এগিয়ে এল এবং তার তুরুপের তাসটি খেলল।

তখন পর্যন্ত শাহবাগ আন্দোলনের সাথে ধর্মের কোন প্রশ্নই জড়িত ছিল না। মাহমুদুর রহমানই শাহবাগ আন্দোলনে যুক্ত কোন কোন অনলাইন নাস্তিক এক্টিভিস্টদের ইসলামবিদ্বেষী পুরনো লেখাপত্র খুঁজে আমারদেশ পত্রিকায় ছাপিয়ে দিল। তার প্রতিক্রিয়ায় হেফাজতে ইসলাম মাঠে নামল, বলা ভালো তাদের নামানো হলো। যুদ্ধাপরাধের ইস্যুকে পরিণত করা হল ধর্মরক্ষার ইস্যুতে। ভারতের দালাল আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধের ইস্যুকে যেভাবে ফ্যাসিবাদের হাতিয়ারে পরিণত করেছিল, তার পাল্টা মার্কিন-পাক-সৌদি দালারা রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের জঘণ্যতম ব্যবহার করেছিল। তারা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করেছিল। এর সাথে ধর্মরক্ষার বাস্তবে কোনই সম্পর্ক ছিল না।

শাসক শ্রেণীর এই দুই ফ্যাসিস্ট মেরু জনগণের স্বার্থে নয়, নিজ হীন রাজনৈতিক স্বার্থে জনগণকে বিভক্ত করে তাদের পেছনে টানতে চেয়েছিল। শাসক শ্রেণীর যে চরম ফ্যাসিবাদী বাইনারি মেরুকরণ জনগণ ও সমাজকে বিভক্ত ও কলুষিত করেছিল, তার অন্যতম রূপকার এই ফ্যাসিস্ট মাহমুদুর রহমান।

বড় আকারে মিথ্যাচার, হলুদ প্রোপাগাণ্ডা, সমাজের বিশেষ অংশকে শিকারে পরিণত করা ফ্যাসিবাদের বিশিষ্ট লক্ষণ।

সেদিন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ উসকে দিতে মাহমুদ যেমন ব্লগারদের হত্যাযোগ্য করে তুলেছিল, আজ পাক ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারীদের উত্তরাধিকারি ফ্যাসিস্ট মাহমুদুর রহমান উগ্রডানপন্থী ফ্যাসিবাদ বিকশিত করার প্রয়োজনে নতুন শিকার তৈরী করতে চাইছে।

13 comments

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন