জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই শহীদদের স্মরণে

“ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, হাসিনা ফ্যাসিবাদের পতন রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী সংস্কারের নতুন চেষ্টা

আমলা-দালাল পুঁজিবাদের সংকট মোকাবেলার জন্যই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হয়েছিল। আবার ফ্যাসিবাদ তার প্রকৃতি অনুযায়ী বৃহত্তর সংকট ডেকে এনে বিস্ফোরিত হয়েছে। সার্বিক সংকটের কারণে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছিল। কিন্তু তা প্রকাশের অবলম্বন পাচ্ছিল না। না ছিল কোন শক্তিশালী গণমুখী সংগঠন, না ছিল ক্ষমতাপ্রত্যাসী শাসক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা। ফলে ঘটনাক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভে ফেটে পড়া ছাড়া এই ক্ষোভপ্রকাশের আর কোন পথ ছিল না। ঘটনাক্রমেই কোটাবিরোধী আন্দোলন ঘিরে এই জনরোষ এক একরোখা অভ্যুত্থান রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা হাসিনা ফ্যাসিবাদ উৎখাত হয়। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম একধাপ অগ্রগতি অর্জন করে।

পূর্বের কোটা আন্দোলনের উত্তরাধিকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামান্য কিছু কর্মী থাকার সুবাদে গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি কোটা আন্দোলনের (২০২৪) উদ্যোগ নিয়েছিল। তারা ছিল ইসলামবাদীদের সাথে ঐক্যপন্থী “লিবারেল” ছাত্রদের ছোট একটি সংগঠন মাত্র। আন্দোলনটা ছিল তাদের ছাত্রভিত্তি বিকাশের আর দশটা চেষ্টার একটা। কিন্তু একদিকে তরুণদের বেকারত্ব, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও ফ্যাসিবাদী দাসত্বের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত করে। অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট সরকারের দমন-নীতি আন্দোলনকে সরকার পতনের অভ্যুত্থানে পরিণত করে।

২০১৩-১৪ সালের সংঘাতের পর জামাত-শিবির-হেফাজতসহ ধর্মবাদী দলগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যে-অর্থ দিয়ে লীগের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। নিয়মিত কাজের বাইরে লিবারেল চেহারায় নানা ধরনের এনজিও, সিএসও, ফাউন্ডেশন, স্টাডি সার্কেল, পত্রিকা গড়ে তুলে তৎপরতা চালায়। এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, ১/১১-এর ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে মার্কিন-ইউরো সাম্রাজ্যবাদ কালার রেভল্যুশনের সমাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তি সম্প্রসারণে ইসলামবাদী ও সংস্কারবাদী শক্তিগুলোকেও যুক্ত করে। কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে, জুলাই আন্দোলন পূর্বপরিকল্পিত কালার রেভল্যুশন।

স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে প্রতিক্রিয়াশীল, প্রগতিশীল সরকারবিরোধী সব সংগঠনই মাঠে নামে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি তার সহজাত মিত্র এবি পার্টি, শিবিরসহ ধর্মবাদী দলগুলো নেতা-কর্মীদের দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পুরোপুরি কব্জা করে। সমর্থন বাড়াতে লিবারেলদেরও কাছে টানে। কিন্তু সচেতনভাবে বামপন্থীদের এড়িয়ে যায়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তৃতীয় শক্তির সাথে যোগসাজোস রক্ষা করে। সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপে কালার রেভুল্যুশনের শক্তিগুলোও সক্রিয় হয় এবং অনিচ্ছুক সেনাবাহিনীও সমর্থন দেয়।

ফলে হাসিনার পতন হলে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ছাত্রনেতাদের ডাকে রাষ্ট্রের চালকের আসন হস্তগত করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল তৃতীয় শক্তির নেতৃত্বে ছাত্র নেতারা ও ‘লিবারেল’ ইসলামপন্থীদের সমন্বয়ে গঠিত অন্তরবর্তী সরকার।

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, নানা কারণে মার্কিন-ভারতের দালাল দেশের শাসকশ্রেণী বৈরী উপদলে বিভাজিত। তারা ক্ষমতায় গেলে অর্থনীতি-রাজনীতিতে নিরঙ্কুশ একচেটিয়া প্রতিষ্ঠা করে। তাদের মতাদর্শিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নির্মাণে এই বৈরীতা প্রতিফলিত হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার শাসক শ্রেণীর উপদলগুলোর মধ্যে বৈরীতা নিরসন করে ক্ষমতার একটা ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বণ্টন নিশ্চিত করতে চায়। যা হবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। এই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার বণ্টনের সাথে সঙ্গতি রেখে সরকার মতাদর্শিক-সাংস্কৃতিক বয়ানও পুনঃনির্মাণ করতে চায়, যাতে তা এই নতুন “বন্দোবস্তুকে” সেবা করবে। এটাই এই রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির সারকথা।

“বাংলাদেশপন্থা”, “অন্তর্ভুক্তিমূলক”, “সভ্যতা রাষ্ট্র” ইত্যাদি ধারণাসহ নব্য বয়ানটি মূলতঃ সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের সাথে সঙ্গতি রেখে রাজনৈতিক উদারতাবাদ-অন্তর্ভুক্তির বুলি এবং ভারতবিরোধী মুসলিম ঐতিহ্যের জাত্যাভিমান আশ্রয় করে শাসক শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য সৃষ্টি করারই প্রয়াস।… বস্তুত এটি একাধারে সাম্রাজ্যবাদী, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী, সামন্তবাদী এবং ক্ষুদে ও মধ্যবিত্তের সমন্বয়ে এক পপুলিস্ট আদর্শ। তাই আপাত দৃষ্টিতে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক হলেও সারবস্তুতে আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া শ্রেণী আদর্শ হওয়ায়, এই ভাবাদর্শ থেকে ফ্যাসিবাদ বিকশিত হতে পারে।

তাই একে আমরা বলছি সাম্রাজ্যবাদী-আমলা-দালাল পুঁজিবাদী-ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী সংস্কারের কর্মসূচি।

কিন্তু বিএনপি জোট, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, ভারত-আওয়ামীলীগ ও স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোর বড় অংশ এসব সংস্কারের মাঝে রাষ্ট্রে অংশীদারিত্বে হিস্যা হ্রাসের সম্ভাবনা দেখছে। ফলে তারা এর বিরোধিতা করছে।

পুরনো এই ক্ষমতা কাঠামোকে ছাড়িয়ে যাবার মত শক্তি সংস্কারপন্থীদের নেই। সুতরাং এই সংস্কার শেষপর্যন্ত কতটা কি হবে, তা নির্ভর করছে শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন উপদলের বাস্তব শক্তি-ভারসাম্যের ওপর।

এই সংস্কার শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত ও দেশপ্রেমিক বুর্জোয়াদের ওপর সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও তাদের দালাল আমলা-বেনিয়া ও ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত শ্রেণীর শোষণ ও শাসনকেই মজবুত করবে। শাসক শ্রেণীর মধ্যে সামান্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করলেও, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি-মধ্যবিত্ত জনগণের ওপর চলবে চরম একনায়কত্ব। সাধারণ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোও তারা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। কারণ সস্তা শ্রম শোষণ ও লুণ্ঠনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নয়া উপনিবেশিক সমাজে শাসক শ্রেণীর পক্ষে জনগণের জন্য খুব বেশী ছাড় দেয়া সম্ভবই নয়।

সুতরাং সংস্কার সত্ত্বেও নয়া-উপনিবেশিক-আমলা-দালাল-সামন্তদের অতিশোষণ-লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি মূলগতভাবে অটুট থাকবে। এ অভ্যুত্থানও নয়া উপনিবেশিক-আমলা-ক্ষয়িষ্ণু সামন্তীয় পুরনো প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা তৈরী করতে পারেনি। অতীত ব্যর্থতার চক্র ভাঙতে পারেনি। কেবল পুরোনো রাষ্ট্রের মালিকদের মধ্যে ক্ষমতার নতুন বিন্যাস অপরিহার্য করে তুলেছে।”

‘ফ্যাসিবাদের পুনরাবর্তন অথবা মুক্তি’ পুস্তিকা থেকে। (প্রথম খসড়া ১৩ নভেম্বর ২০২৪)

ছবি: ৫ আগস্ট ২০২৪

3 comments

আপনার মূল্যবান মন্তব্য লিখুন