“যখন কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির শরীরে এমন আঘাত করে যার ফলে তার মৃত্যু ঘটে, তখন আমরা সেই কাজটিকে নরহত্যা (manslaughter) বলি; আর আক্রমণকারী যদি আগে থেকেই জানত যে এই আঘাতের ফলে মৃত্যু নিশ্চিত, তবে আমরা তার এই কাজটিকে খুন বা হত্যা (murder) বলি। কিন্তু সমাজ যখন শত শত সর্বহারা শ্রমিককে এমন এক অবস্থায় ঠেলে দেয় যেখানে তারা অনিবার্যভাবেই অকাল ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়—যা তরবারি বা বুলেটের আঘাতে মৃত্যুর মতোই এক সহিংস মৃত্যু; সমাজ যখন হাজার হাজার মানুষকে জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা থেকে বঞ্চিত করে এমন এক মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে রাখে যেখানে তারা বেঁচে থাকতে পারে না… এবং এটি জেনেও সমাজ যদি এই পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না করে তা বহাল রাখে, তবে সমাজের এই কাজটিও ঠিক একজন ব্যক্তির করা খুনের মতোই নিশ্চিত একটি হত্যাকাণ্ড; এটি একটি প্রচ্ছন্ন, বিদ্বেষপূর্ণ হত্যাকাণ্ড, যার বিরুদ্ধে কেউ নিজেকে রক্ষা করতে পারে না…”
—- ফেডারিক এঙ্গেলস, ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা
গতকাল আবারো ৮ গার্মেন্টস শ্রমিককে পুড়িয়ে মারা হলো। এটা কোন বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এক খবরে দেখা যাচ্ছে ২০১৫-২০২২ সালের মধ্যে ৭২৪ গার্মেন্টস শ্রমিক স্রেফ আগুনে পুড়ে খুন হয়েছে। এই তথ্য প্রমাণ করে, এই হত্যাকাণ্ড গার্মেন্টস শিল্পের কাঠামোগত ফল।
সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানির জন্য সস্তা শ্রমের ঠিকাদারি করা এদেশের ধনী শ্রেণীটি বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম গতিতে যে অতিধনী হচ্ছে, তা এই খুনে নব্য দাসতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই। এই প্রচন্ড শোষণ-নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা সমগ্র সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থাতে প্রতিফলিত হচ্ছে। হাসিনার ফ্যাসিবাদের ভিত্তিও ছিল এই নিষ্ঠুর নব্য দাসতান্ত্রিক অর্থনীতি। গতকাল ৮ শ্রমিকের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করছে, ২৪-এর অভ্যুত্থান ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী হাসিনার পতন ঘটাতে পারলেও অতিধনী শ্রেণীর নব্য দাসতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আঁচড়টুকু কাটতে পারেনি। আবারো নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতায় অভ্যুত্থানের ফল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালালরা কুক্ষিগত করতে সক্ষম হয়েছে। অভ্যুত্থানের আঘাতে শাসক শ্রেণী ও তার রাষ্ট্র সাময়িকভাবে থাবার মধ্যে নখ লুকিয়ে ফেলেছে মাত্র, সময় হলে ঠিকই সেই নখ বেরিয়ে আসবে।
এই কাঠামোগত হত্যার মিছিল, এই নব্য দাসতন্ত্র, চরম বৈষম্য- বঞ্চনার অবসান করতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বারবার ভুল নেতৃত্বে সংগ্রাম ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না। আজকের দুনিয়ায় কেবল শ্রমিক শ্রেণীই এই মুক্তির লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম- এই সত্য শ্রমিক-জনতাকে উপলব্ধি করতে হবে। সংগ্রামের লক্ষ্য, কর্তব্য, শত্রু-মিত্র ও নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রখর সচেতনতা ছাড়া কোন সংগ্রামের ফল জনগণ রক্ষা করতে পারবে না।




https://addlinks.pro/pCQpE